ড. এম এ মাননান
চারদিকে এত টেলিভিশন (টিভি) চ্যানেলের ছড়াছড়ি। অথচ বিশাল শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য নেই একটি নিবেদিত, বিশেষায়িত টিভি চ্যানেল। আসলে গতানুগতিক নয়, একটি নিবেদিত টিভি চ্যানেলের প্রয়োজনীয়তা অনেক আগেই অনুভব করেছিলাম, যা এ দেশের মানুষের জন্য সার্বক্ষণিকভাবে সহজে শিক্ষাদানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হবে। একটি প্রকল্পও ইউজিসির মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিলাম বাংলাদেশ উন্মুুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে। মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদন করে পাঠিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। সেটি ২০১৭ সালের কথা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চারপক্ষীয় (উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের) আলোচনা বৈঠকও হয়েছে। তবে ফাইলটি জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল (একনেক) পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা সম্ভবত হারিয়ে ফেলেছে। এ বছরের মার্চ থেকে কোভিড-১৯ মহামারি রূপে দেখা দেওয়ার পর বাংলাদেশের সব স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বপ্রকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ঘরে বসে থেকে প্রায়-শিক্ষাহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। বিষয়টি অনুভব করে পলিসি প্রণেতারাসহ অনেকেই অনলাইন শিক্ষার পাশাপাশি টিভিতে লাইভ শিক্ষাদানের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছেন দেখে মনে হলো, বিষয়টি নিয়ে নিজস্ব ভাবনাটা খুলেই বলি।
বর্তমানের টিভি চ্যানেলগুলো মূলত সংবাদনির্ভর এবং বিনোদনমূলক। আনন্দ-বিনোদনের ওপরই এগুলো সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় (নিউজ চ্যানেলগুলো শুধু ব্যতিক্রম)। বাণিজ্যই প্রধান লক্ষ্য। দু-একটিতে মাঝেমধ্যে শিক্ষাসংক্রান্ত কিছু অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হলেও সেগুলো ওদের গৌণ বিষয়। সাধারণত অফ-টাইমে চ্যানেলগুলো স্বল্প সময়ের জন্য শিক্ষা-অনুষ্ঠান প্রচার করে, যার কারণে শিক্ষার্থীরা এসব সম্প্রচারের সুফল ভোগ করতে পারে না। গুরুত্বহারা এসব অনুষ্ঠানের তেমন কোনো দর্শকপ্রিয়তা নেই। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও এ বিশাল ক্ষেত্রটির জন্য একটি বিশেষায়িত টিভি চ্যানেলের কথা কখনো ভাবা হয়নি। শুনেছি, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ উন্মুু্ক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সরকার একটি টেরেস্ট্রিয়াল প্রযুক্তির টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠার জন্য অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু অজানা কারণে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ মনে হয়, সবাই বিশ্বাস করেন যে, বিশেষায়িত শিক্ষামূলক টিভি চ্যানেলের সামাজিক প্রভাব ব্যাপক। সঠিকভাবে ব্যবহূত হলে এরূপ টিভি চ্যানেল শিক্ষার্থীদের (বিশেষ করে শিশু-কিশোর-তরুণদের) জন্য কার্যকর ও শক্তিশালী শিখন-হাতিয়ার (লার্নিং টুল) হতে পারে। শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষাবিনোদন (এডুটেইনমেন্ট) তথা আমোদমূলক ও আগ্রহ-উদ্দীপক বিষয়গুলো সহজে বোধগম্য করে শিক্ষা চ্যানেলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা সম্ভব। কোনো কোনো দেশে বয়স্কদের জন্যও শিক্ষামূলক টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট্ট দ্বীপ দেশ ‘ভানুয়াতু’ শিক্ষামূলক টিভি চ্যানেলে তরুণ সমাজ ও বয়স্কদের জন্য নিয়মিত শিক্ষামূলক বিষয়াদির ওপর অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। টিভি চ্যানেলটি পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য, সুস্থ যৌন আচরণ, সাক্ষরতা, সংক্রামক রোগ যেমন এইডস, বিভিন্ন রকমের ভাইরাসজনিত রোগ ইত্যাদি জনগুরুত্বপূর্ণ আগ্রহ-উদ্দীপক বিষয়গুলোর ওপর বিনোদনমূলক গল্পের মাধ্যমে দর্শকদের শিক্ষাদানের কর্মসূচি হাতে নিয়ে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে।
একটি নিবেদিত শিক্ষামূলক টেলিভিশন চ্যানেল (ডেডিকেটেড টিভি চ্যানেল) বাংলাদেশে থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে বিতর্ক করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। প্রয়োজনের বিষয়টি প্রায়-সর্বজনস্বীকৃত। এখন দরকার এটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া। সেটা টেরেস্ট্রিয়াল কিংবা স্যাটেলাইট প্রযুক্তির যে কোনোটাই হোক না কেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রস্তুতকৃত প্রকল্পটিতে স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছে। তবে চ্যানেলটি হবে গতানুগতিক চ্যানেলগুলো থেকে একটু ভিন্ন প্রকৃতির। এটি হবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি বিশেষায়িত টিভি চ্যানেল।
টিভি চ্যানেলটি যেভাবে কাজ করবে তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরছি। প্রস্তাবিত টিভি চ্যানেলটির মাধ্যমে বিভিন্ন উপায়ে অনুষ্ঠান প্রোডাকশন ও সম্প্রচার করা যেতে পারে। (১) স্টুডিওভিত্তিক লাইভ প্রোডাকশন : অনুষ্ঠানের রিসোর্স পারসন নির্বাচনের পরে তিনি স্টুডিওতে ক্যামেরার সামনে বিষয়বস্তু উপস্থাপন করবেন। ক্যামেরায় ধারণকৃত ইমেজ ইলেকট্রিক সিগন্যালে পরিণত হয়ে ‘প্রোডাকশন কনট্রোল অটোমেশনের’ ভিডিও সুইচারে চলে যাবে। প্রোডাকশনটি মাল্টি-ক্যামেরায় হলে প্যানেল প্রোডিউসারের নির্দেশ অনুসারে বিভিন্ন ক্যামেরার আউটপুট সিগন্যাল পর্যায়ক্রমে ভিশন মিক্সারের মাধ্যমে প্রোডাকশন কন্ট্রোল অটোমেশন ডিভাইসে আসবে। তারপর মাস্টার কন্ট্রোল অটোমেশনের মাধ্যমে আর্থস্টেশনে প্রেরণ করা হবে। আর্থস্টেশনের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সিগন্যাল স্যাটেলাইটে প্রেরণ করবে। স্যাটেলাইট গ্রাহকযন্ত্রের মাধ্যমে সিগন্যাল রিসিভ করবে। তারপর প্রেরকযন্ত্রের মাধ্যমে স্যাটেলাইট টিভি রিসিভারের (এসটিভিআর) উদ্দেশে প্রেরণ করবে। এসটিভিআর টিভি সিগন্যাল তৈরি করে টেলিভিশন সেটে প্রেরণ করবে। এভাবে দর্শক সরাসরি সম্প্রচারকৃত অনুষ্ঠান টেলিভিশন সেটে দেখতে পাবেন। সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের বাইরের অর্থাত্ দূরের কোনো দর্শক বা অংশগ্রহণকারী অংশগ্রহণ করতে চাইলে skype talking device ব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রোডাকশন কন্ট্রোল অটোমেশনে সিগন্যাল প্রেরণ করা হবে। প্রোডাকশন কন্ট্রোল রুমের ভিডিও সুইচারের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে সম্পৃক্ত হবেন।
(২) আউটডোর লাইভ প্রোডাকশন ও সম্প্রচার : কখনো কখনো আঞ্চলিক প্রোগ্রাম এই চ্যানেলের মাধ্যমে সম্প্রচার করার প্রয়োজন হবে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আঞ্চলিক কেন্দ্র ও উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র বা দূরবর্তী কোনো স্থান থেকে অনুষ্ঠান সম্প্রচারের প্রয়োজন হলে মোবাইল প্রোডাকশন ইউনিটের মাধ্যমে প্রচার করা যাবে।
(৩) প্রি-রেকর্ডেড প্রোডাকশন ও সম্প্রচার :প্রস্তাবিত টিভি চ্যানেলের অধিকাংশ অনুষ্ঠান (স্টুডিও-বেইজড বা আউটডোর-বেইজড) প্রাথমিক পর্যায়ে প্রোডাকশন কন্ট্রোল রুমে রেকর্ডিং ডিভাইস (ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার বা কম্পিউটার সার্ভিস)-এ রেকর্ড করা হবে। তারপর পোস্ট-প্রোডাকশনের জন্য রেকর্ডেড অনুষ্ঠানটি ভিডিও এডিটিং ইউনিটে নেওয়া হবে। এখানে প্রি-রেকর্ডেড অনুষ্ঠানের ভুলত্রুটি সংশোধন করে তার সঙ্গে ভিডিও এফেক্ট, সাউন্ড এফেক্ট, গ্রাফিক্স অ্যান্ড অ্যানিমেশন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ইত্যাদি সংযোজন করে একটি পূর্ণাঙ্গ টিভি অনুষ্ঠান তৈরি করা হবে।
ফলে দর্শক আগে রেকর্ডকৃত অনুষ্ঠান টিভি সেটে দেখতে পাবেন। (৪) ক্লাউড স্টোরেজের ব্যবহার : এ চ্যানেলটির সম্প্রচারব্যবস্থার একটি বিশেষ দিক হলো কোনো কারণে কোনো দর্শক তার কাঙ্ক্ষিত অনুষ্ঠান দেখতে না পেলে তা পরবর্তী সময়ে ক্লাউড সার্ভার থেকে ডাউনলোড করে দেখতে পারবেন। কারণ সব অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ক্লাউডে নির্দিষ্ট লিংকে সংরক্ষিত থাকবে।
এ চ্যানেলটি হবে আক্ষরিক অর্থেই দেশের সর্বপ্রকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ইনস্টিটিউট, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়) জন্য একটি কেন্দ্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম। বাউবি শুধু কেন্দ্রীয় হাব হিসেবে এটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে। চ্যানেলটি চলবে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা। থাকবে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র, কুইজ, শিক্ষাবিনোদনসহ শিক্ষাসমাচার ও তথ্যসহ অন্য শিক্ষামূলক প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি। বিভিন্ন পাঠ্য, যেমন— বিজ্ঞান, ভাষা, গণিত, প্রযুক্তি ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দূরশিক্ষণের শিক্ষার্থীদের জন্য দৃশ্যমান এবং সহজে বোধগম্য হবে। দেশের প্রয়োজনে বিদেশের খ্যাতিমান শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করে তাদের দিয়ে অডিও-ভিডিও প্রোগ্রাম তৈরি করানো হবে, কনটেন্ট বানানো হবে। এমনকি, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা হবে, তখন অনুমতি সাপেক্ষে বাউবির মিডিয়া টিম ‘এক ক্যামেরা এক লাইট’ পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান লাইভ সম্প্রচার করতে পারবে। থাকবে বিনা মূল্যে ‘ভিডিও অন ডিমান্ড’ সুযোগ।
শিক্ষামূলক টিভি চ্যানেল সম্পর্কে আমরা শিখতে পারি অন্যান্য দেশ থেকেও। শিক্ষামূলক টেলিভিশন ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে যেসব দেশের তারা হতে পারে আমাদের উদাহরণ, যেমন ব্রাজিল, চীন, ইথিওপিয়া, ঘানা, ভারত, মেক্সিকো ও নিউজিল্যান্ড। এপ্রিল থেকে চিলিতে ‘টিভি এডুচিলি’ নামে একটি শিক্ষামূলক টিভি চ্যানেল চালু করা হয়েছে। পাকিস্তানে রয়েছে ‘টেলিস্কুল চ্যানেল’ (চলে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত), যার অনুষ্ঠানগুলো টেরিস্ট্রিয়াল, স্যাটেলাইট ও কেব্ল অপারেটরের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারতের ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটিতে অনেক বছর ধরেই চলছে নিজস্ব টিভি চ্যানেল ‘জ্ঞানদর্শন টিভি’। নিউজিল্যান্ডে চালু করা হয়েছে ‘পাপা কাইনগা’ নামক শিক্ষা সম্প্রচার কার্যক্রম এবং টিভিএনজেড ভিডিও অন ডিমান্ড। অনেক দেশ শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য টোল-ফ্রি টেলিফোন ব্যবস্থা চালু রেখেছে।
জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সারা দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী উভয়েই প্রতিনিয়ত দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন এবং অনলাইনে দূরশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন। এ বছর বাজেটে শিক্ষার জন্য বরাদ্দও বাড়িয়েছেন। তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে মিল রেখে বলতে চাই, উন্মুুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীসহ বাংলাদেশের প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী যাতে সর্বোত্তম পাঠদান ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্যই একটি শিক্ষামূলক টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
লেখক :কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
