ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, তামান্না মাসতুরা
পুুরো বিশ্ব এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মুখগুলো সব ঢেকে গেছে মাস্কের আড়ালে আর হাত বন্দি হয়েছে গ্লাভসের আবরণে। মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়ে গেছে, মানসিক বিপর্যয় বাড়ছে, বিশ্ব অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে যেতে বসেছে। তবু কোনোভাবেই থামছে না এই ভাইরাসের তাণ্ডব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই মহামারিকে ‘সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের চেয়েও বেশি শক্তিশালী’ বলে আখ্যায়িত করেছে। নিজেকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক চিকিত্সাবিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে এই ভাইরাস।
গবেষকদের মতে, করোনা ভাইরাস বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফলে উদ্ভূত হয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে কিছু সামুদ্রিক প্রাণী, যেমন—বেলুগা তিমি করোনা ভাইরাস বহন করতে পারে। উহানের হুয়ানান সামুদ্রিক খাবারের পাইকারি বাজারকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাব্য স্থান বলে মনে করা হচ্ছে। জীবনধারণের জন্য যে খাদ্যের ওপর আমরা নির্ভরশীল, তা যদি যথোপযুক্ত উপায়ে উত্পাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও ভক্ষণযোগ্য হিসেবে তৈরি করা না হয়, তবে সেই খাদ্য থেকে রোগ-ব্যাধির সংক্রমণ এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
করোনা ভাইরাস আমাদের ভুলে যাওয়া শিক্ষাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, একই সঙ্গে জানান দিচ্ছে সামগ্রিক সচেতনামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য উপযুক্ত সময় এখনই। যেহেতু এই রোগের প্রতিকার হিসেবে এখনো কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি, তাই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। সচেতনামূলক অভ্যাস অনুশীলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে বুস্ট আপ করা তথা শরীরের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যকর জীবনব্যবস্থার মাধ্যমে এই রোগের বিরুদ্ধে নিজেদের তৈরি করে তোলার পাশাপাশি প্রয়োজন ওয়েট মার্কেটের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ উন্নত করা এবং নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ চেইন নিশ্চিত করা।
দীর্ঘদিন থেকেই আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে নিরাপদ খাদ্য সব ভোক্তার পৌঁছে দেওয়া। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য, বিশেষত কৃষিজাত পণ্য গুণগত মান ঠিক রেখে সব শ্রেণির ভোক্তার কাছে সুলভ মূল্যে সরবরাহ করার মাধ্যমেই মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে তোলা এবং সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠন করা সম্ভব। বাংলাদেশে কৃষি ও খাদ্য উত্পাদন বাড়লেও খাদ্যের গুণমান রক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায়নি। খাদ্য উত্পাদনে সঠিক জ্ঞানের অভাব, বাজারজাতকরণ ও বিপণনে দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সরবরাহ চেইনে কুশীলবদের অসাধুতার কারণসমূহ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য জোগানে অন্তরায়। কৃষিপণ্যের সরবরাহ চেইনে উত্পাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিপণন ও খাদ্যগ্রহণ করা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে সচেতনভাবে কিংবা কখনো কখনো অসচেতনতার কারণে জীবাণু ও রাসায়নিক দ্রব্যাদি দ্বারা খাদ্যপণ্য বিষাক্ত বা দূষিত হয়ে থাকে। সাধারণত খাদ্যে দুই ধরনের দূষণ তৈরি হয়—জীবাণুসংক্রান্ত দূষণ যেমন বিভিন্ন ধরনের জীবাণু, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, ইত্যাদি এবং রাসায়নিক দ্রব্যাদি দ্বারা দূষণ যেমন অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহার, ফরমালিন ও প্রিজারভেটিভ ব্যবহার, পশুর ওষুধের অবশিষ্টাংশ যা অগোচরে খাদ্যে অনুপ্রবেশ করে, ইত্যাদি। তাই উত্পাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্যের গুণমান ঠিক রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আমাদের দেশে ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন এবং ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণীত হয়। কিন্তু এসব আইনের প্রয়োগ এখনো সীমিত কিংবা নিরাপদ খাদ্য ও নিরাপদ খাদ্য আইন বিষয়ে সরবরাহ চেইনে কুশীলবদের নেই কোনো স্পষ্ট ধারণা। কৃষিজাত পণ্যের ক্ষেত্রে গুণমান রক্ষা ও দূষণ রোধে আইনের প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন কৃষিপণ্য উত্পাদক ও সরবরাহ চেইনের কুশীলবদের নিজ নিজ দায়িত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান সরবরাহ করা। এ ক্ষেত্রে ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন বিষয়ে তাদের অবগত করার পাশাপাশি তাদের জন্য বিভিন্ন প্রকার প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রশিক্ষণ প্রদান ও সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আধুনিক পদ্ধতিতে সঠিক গবেষণা পরিচালনার পাশাপাশি ফুড সেফটি ল্যাব বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও উত্পাদন এলাকায় সম্প্রসারণ করা সহকার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি পদক্ষেপ হচ্ছে আমাদের কৃষিপণ্যের গুণমান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করা যায় আর তার জন্য লেবেলিং ও ট্রেসিবিলিটি ব্যবস্থা চালুসহ জোরদারকরণ অত্যন্ত জরুরি। আর এসব কিছুর জন্য করণীয় হলো : (১) উত্তম কৃষি-উত্পাদন পদ্ধতি অনুশীলন বা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গ্যাপ—কৃষিপণ্য উত্পাদনের সময় গুণমান অক্ষুণ্ন রাখতে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা; (২) উত্তম প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি অনুশীলন (জিএমপি), কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ; এবং (৩) প্রক্রিয়াজাতজনিত সংকট চিহ্নিতকরণ ও ধাপসমূহের নিয়ন্ত্রণ (হ্যাজার্ড অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কন্ট্রোল পয়েন্ট)— খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়ে সম্ভাব্য সমস্যা চিহ্নিত করা ও তা নিয়ন্ত্রণ করার কারিগরি পদ্ধতি অনুসরণ করা। এছাড়া ভোক্তা পর্যায়ে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে খাদ্যসংরক্ষণ ও টেবিল খাবার তৈরি করার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম হিসেবে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো। আর তার মাধ্যমে সম্ভব হবে খাদ্য সরবরাহ চেইনের উত্পাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত খাবারের গুণমান বজায় রাখা ও ওয়েট মার্কেটে সৃষ্ট সম্ভাব্য রোগ ও অন্যান্য খাদ্যবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যত্ মহামারির ঝুঁকিকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসা।
নিরাপদ খাদ্য যেমন সবার জন্য প্রয়োজন তেমনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পণ্য উত্পাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ, বিপণন ও খাদ্য প্রস্তুতকরণ প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের সচেতনতা প্রয়োজন। আর সে সচেতনার মাধ্যমে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের সারিতে নিতে হলে স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম জনশক্তির বিকল্প নেই। আর কর্মক্ষম জনশক্তির জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
করোনা ভাইরাস মহামারি শুধু বিপর্যয়ই আনেনি, আমাদের আত্মোপলব্ধির এক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আমাদেরকে এখন ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সব রকম বিপর্যয় ও তার প্রতিরোধ-সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে হবে, বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে এবং সর্বাত্মক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থবিরতার এই সময়েও মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকের আহ্বান ‘সবার জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য :মুজিববর্ষে অঙ্গীকার’ ভুলে গেলে চলবে না বরং এই সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই মিলে এই অঙ্গীকার পূরণে সচেষ্ট ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখতে হবে।
n লেখকদ্বয় :অধ্যাপক, কৃষিব্যবসায় ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ; প্রকল্প ইন্টার্ন ও এমএস গবেষক, কৃষিব্যবসায় ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
