আসন্ন মার্কিন নির্বাচন ও বিশ্বরাজনীতির গতি-প্রকৃতি

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২০, ২১:১২

সাইফুল ইসলাম হাফিজ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫৯তম প্রেসিডেন্ট ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এখনো তিন মাসের বেশি বাকি। কিন্তু আসন্ন এ লড়াইয়ে বিজয়ী হতে তোড়জোড় শুরু করেছে প্রধান দুই শিবিরই। আমেরিকা এখনো যেহেতু বিশ্ব মোড়লের আসনে আছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তাই সারা বিশ্বের কৌতূহলোদ্দীপক নজরও এখন আগামী মার্কিন নির্বাচনের দিকে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র হলো পৃথিবীর শীর্ষ আমদানিকারক দেশ। এই দেশকে ঘিরে অনেক দেশেরই আছে বাণিজ্যিক চাহিদা। অর্থনীতি সচল রাখতে তাদের চোখও আসন্ন নির্বাচনের দিকে। রিপাবলিকানরা আসলে তাদের বাণিজ্যনীতি কেমন হবে? বা ডেমোক্র্যাটরা আসলে কি তাদের স্বার্থ হাসিল হবে? এ নিয়ে বহু রাষ্ট্রেই চলছে জল্পনা-কল্পনা। নভেম্ব্বরে কি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ জীবনের যবনিকাপাত ঘটবে? নাকি ফের সব হিসাব-নিকাশ পালটে দিয়ে জো বাইডেনও হাঁটবেন হিলারির পথে? দলের ওলট-পালট হলে অর্থনীতির থেকে বেশি পরিবর্তন হবে বিশ্বরাজনীতির। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খুব কম ইস্যুই আছে যেটাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নাই। আসন্ন এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে পালটাতে শুরু করেছে বিশ্বরাজনীতির গতি-প্রকৃতি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ কিছু বিষয় বেশি আলোচিত হয়; মধ্যপ্রাচ্য, চীন-আমেরিকা, রাশিয়া, আফগান ইস্যু, ভারত-পাকিস্তানসহ বেশ কিছু ইস্যু। মধ্যপ্রাচ্যে সংকট শুরু হয়েছে কয়েক দশক আগে কিন্তু এর সুরাহা এখনো হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে কয়টি দেশকে চরম শত্রু মনে করে তার মধ্যে বেশ পরিচিত হলো ইরান। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য হতে সেনা প্রত্যাহার করতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে সিরিয়া ও ইরান থেকে আংশিক কমিয়েও নিয়েছে। রাশিয়া-সৌদির তেল যুদ্ধের কারণে শীতল সম্পর্ক পার করছে ওয়াশিংটন ও রিয়াদ। সৌদি আরব থেকে প্যাট্রিয়ট মিসাইলও সরিয়ে নিয়েছে। ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সেনা প্রত্যারেরও। আর এশিয়ার দেশ আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনা তো সবারই জানা। তালেবানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতিও কমিয়ে নিয়েছে পেন্টাগণ। এর পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। অনেক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর অনুপস্থিতির কারণে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ইরানের জন্য। কিন্তু ইরান এখনই কোনো আগ্রাসি পদক্ষেপ নিতে পারবে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ভিন্ন মতের ছায়া দৃশ্যমান। ইরানের রেভলুশনারি গার্ড চাচ্ছে এখনই পদক্ষেপ নিতে। কিন্তু উদারপন্থিরা আগামী মার্কিন নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইছে। আর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রনীতির চাকা তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। তাদের অবৈধ কার্যকলাপে মদত পেতে সব সরকারকেই প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চীনকে চরম শত্রু হিসেবেই বিবেচনা করে। কিন্তু সবার এই  ধারণায় সংশয়ের জন্ম দিয়েছে জন বোল্টনের ‘দ্য রুম হোয়্যার ইট হ্যাপেন্ড’ বইটি। বইয়ে মি. বোল্টন লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২০-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যাতে জিততে পারেন তার জন্য চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাহায্য চেয়েছেন। প্রেসিডেন্ট কৃষকদের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং নির্বাচনি ফলাফল প্রভাবিত করতে চীনে সয়াবিন এবং গমের বিক্রি বাড়িয়ে দিয়েছেন। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আঁতাতের বিতর্ক পালটে দিয়েছে ট্রাম্পের নির্বাচনি সমীকরণ। কয়েকদিন আগে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক  টাইমস’ ও ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের দাবি, আফগানিস্তানে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর পাশাপাশি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের সেনাদের হত্যা করার বিনিময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের পুরস্কার পায় তালেবান। অবশ্য এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া ও তালেবান উভয়ই। কিন্তু অভিযোগ ওঠেছে যে রাশিয়া গত নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ভূমিকা পালন করায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে চাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। উক্ত দাবি সত্য হলেও ট্রাম্প নির্বাচনকে সামনে রেখে মস্কোর বিরুদ্ধে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই ব্যাপক। কারণ, ট্রাম্পের জন্য হুমকি হতে পারে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে সন্দেহের তির ছুড়ছে কয়েকটি রাষ্ট্রের দিকে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও দাবি করেছেন, আগামী নভেম্ব্বরে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলকে নিজেদের অনুকূলে বদলে দেওয়ার জন্য ইরান, রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া চেষ্টা শুরু করেছে। ওয়াশিংটন এ প্রচেষ্টা প্রতিহত করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অন্যসব দেশের মতো নয়। বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে থাকা দেশটির নির্বাচন নিয়ে সবারই কম-বেশি আশা-আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের চেয়ে ‘অবরোধ অস্ত্র’কে ব্যবহার করেছেন বেশি। ফলে অর্থনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে ইরান, ভেনিজুয়েলাসহ কয়েকটি দেশ। তাছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে গরমও করেছেন কয়েকবার। ইউক্রেন ইস্যুকে কেন্দ্র করে অভিশংসনেরও মুখোমুখি হয়েছেন। আগামী নির্বাচনি লড়াইয়ে কে শেষ হাসিটা হেসে বিশ্বকেও হাসাবেন শান্তির  বার্তা দিয়ে, তা দেখতে নভেম্ব্বর পর্যন্ত  আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়