এনামুল হক, খুলনা অফিস
করোনার বিরূপ প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর। গত পাঁচ মাসে খুলনার বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। চরম সংকটে পড়েছে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। চালু থাকা অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াইয়ে কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু থেমে নেই মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিত্সার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন, মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষদের। পেশা বদল করে এসব মানুষ এখন জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেশা বদল দীর্ঘস্থায়ী হলে সমাজ ও অর্থনীতির ওপর চাপ পড়বে।
দীর্ঘ চার মাস পর স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সীমিত পরিসরে খুলেছে খুলনার মার্কেট, বিপণন ও শপিং কমপ্লেক্স। আর্থিক সংকটে পড়ে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছেন। চায়ের দোকানদার, ভ্রাম্যমাণ বাদাম বিক্রেতা, ফেরিওয়ালা, ফুচকা বিক্রেতা, সড়কের পাশের ফাস্টফুডের দোকানদাররা লোকসানের কারণে দোকানপাট বন্ধ করে দিয়েছে। এসব মানুষ সংসার চালাতে পেশা বদল করছেন। তাদের মধ্যে কেউ সড়কের পাশে হ্যান্ড সেনিটাইজার, স্যাভলন, মাস্কসহ করোনা সুরক্ষা সামগ্রী বিক্রি করছেন। কেউ আবার মৌসুমি ফল বিক্রির ব্যবসা বেছে নিয়েছেন। কেউ আবার গ্রামে গিয়ে কৃষি শ্রমিকের কাজ করছেন। আবার অনেকে রিকশা-ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
নগরীর টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা ত্রিশোর্ধ্ব সাইফুল ইসলাম। তিনি একটি দোকানের সেলসম্যান ছিলেন। করোনার কারণে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার চাকরি চলে গেছে। এখন তিনি ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা উপার্জনের পথ বেছে নিয়েছেন। তিন পুরুষের ভাঙ্গারি ব্যবসা নগরীর দৌলতপুরের বাসিন্দা মফিজুর রহমানের। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে ভাঙ্গারি কেনা-বেচা করেন। এখন তিনি মৌসুমি ফল বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, পুঁজি যা ছিল সব প্রায় শেষ। তাই অনেক ভেবে এই কাজ করছি। সংসার ঠিকমতো চলছে না।
নগরীর ফুলবাড়ি গেট এলাকায় কাটা কাপড় বিক্রেতা হাফিজুর রহমান বলেন, করোনায় ২০/২২ বছরে পেশা বদলে এখন হ্যান্ড সেনিটাইজ স্যাভলন, মাস্ক বিক্রি করছি। শুরুতে ভালো আয় হলেও এখন আর তেমন আয় নেই।
খুলনা সম্মিলিত নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, সামাজের একটি বড় অংশ বেঁচে থাকার তাগিদে সাময়িকভাবে পেশা পরিবর্তন করছেন। এটা যখন স্থায়ী পেশায় রূপ নেবে তখন এর ভয়াবহতা আমরা দেখতে পাব। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজন নরসুন্দর সাময়িকভাবে তার পেশা পরিবর্তন করছেন। কিছুদিন পরে এটা স্থায়ী পেশায় রূপ নেবে। করোনার পরে সে আর এই পেশায় হয়তো ফিরবে না। তখন চুল কাটবে কে? তখন সমাজে অসঙ্গতি দেখা দেবে। তাই রাষ্ট্রের উচিত এই শ্রেণি-পেশার মানুষের দায়িত্ব নেওয়া। তা না হলে সামনে রাষ্ট্রকে আরো একটি সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান মোছা. তাসলিমা খাতুন বলেন, সাময়িকভাবে যারা অন্য পেশায় যাচ্ছে তারা সেই পেশায় অভিজ্ঞ নয়। সে কারণে আয়ও ভালো হচ্ছে না। তাদের সংসারও ঠিকমতো চলছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ করাতে হচ্ছে। এটা দীর্ঘমেয়াদি হলে আগের পেশায় ফিরে আসতে বেশ কষ্টসাধ্য হবে। তখন অর্থনীতির ওপর একটি বড় চাপ পড়বে। সেই চাপ সমাজের সব স্তরের মানুষকে বহন করতে হবে।
খুলনা সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক খান মোতাহার বলেন, এরই মধ্যে তালিকা করে দলিত সম্প্রদায়, প্রতিবন্ধী, হিজড়া ও হরিজনসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মানুষদের আর্থিক অনুদান দিয়েছি। কর্মক্ষম শ্রমজীবীদেরকে ঐভাবে কোনো অনুদান দেওয়া হয়নি। তাছাড়া যে বরাদ্দ পাওয়া যায় তার থেকে কয়েকগুণ বেশি থাকে চাহিদা। তারপরও আমরা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করার সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছি।
