শাহীন হাফিজ, বরিশাল অফিস
পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) স্বাক্ষর জাল করে ১ কোটি ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, উপজেলায় আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ১০টি কমিউনিটি সেন্টার ও ছয়টি ঘাটলা নির্মাণ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে স্বাক্ষর জাল করে এ টাকা এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে তুলে নেওয়া হয়েছে। অতি সম্প্রতি বদলি হওয়া কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুনিবুর রহমান (বর্তমানে বরিশাল সদর উপজেলা ইউএনও) এবং বর্তমান ইউএনও আবু হাসানাত মো. শহীদুল হক এই জালিয়াতির প্রমাণ পেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছেন। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসককে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
কলাপাড়া ইউএনও অফিস সূত্র, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের নির্মাণ বরাদ্দপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুকূলে অর্থ বরাদ্দ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এসংক্রান্ত বরাদ্দপত্র ইউএনওর অফিশিয়াল ইমেইল কিংবা ডাকযোগে ইউএনওর নামে আসার কথা। কিন্তু কলাপাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) তপন কুমার ঘোষ প্রকল্পের বরাদ্দপত্র নিজেই সরবরাহ করেন। ঐ বরাদ্দপত্র এবং জালিয়াতি করা প্রকল্পের অন্যান্য কাগজপত্রে ইউএনওর স্বাক্ষর জাল করা হলেও স্মারক নম্বরসহ নানা ক্ষেত্রে অসংগতি রয়েছে। হিসাবরক্ষণ অফিসে ক্রয়, সরবরাহ ও সেবা বাবদ ব্যয়ের দাখিল করা বিলে থাকা মূল তারিখের সঙ্গে হাতে লেখা টোকেন নম্বর ও তারিখে অসংগতি রয়েছে। এছাড়া জালিয়াতির সব কাগজেই উপজেলা প্রশাসনের স্মারকের স্থলে অন্য স্মারক নম্বর ব্যবহূত হয়েছে। এমন একাধিক অসংগতি জানার পর টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নিয়োগ, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ব্যাংক হিসাব ছাড়া বিলের সমুদয় টাকা ঠিকাদারের হিসাবে সরাসরি পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন।
এ প্রসঙ্গে কলাপাড়া উপজেলার সাবেক নির্বাহী অফিসার মুনিবুর রহমান (যার সই জাল করা হয়েছে) ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, তিনি দায়িত্বে থাকাকালে চলতি বছরের ১৫ মার্চ পিআইও তপন কুমার ঘোষ হাতে করে এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে এলে তিনি নিয়মের কথা জানিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেন। এরপর ২২ মার্চ বদলি হয়ে তিনি বরিশাল সদর উপজেলায় যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে জানতে পারেন, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সারিকা এন্টারপ্রাইজ ৭ এপ্রিল বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। প্রকল্পের এসব বিলে মার্চ মাসের ২২ তারিখে (বদলি হওয়ার তারিখ) করা তার স্বাক্ষর রয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তপন কুমার ঘোষের স্বাক্ষরও রয়েছে। ইউএনও দাবি করেন, তার কলাপাড়ায় চাকরিকালীন স্বাক্ষর অফিসে সংরক্ষিত রয়েছে। এ প্রকল্পের অধীন কোনো ফাইল চালু কিংবা ব্যাংক হিসাবও খোলা হয়নি। ভুয়া স্মারক নম্বর ফেলে প্রকল্পের কাগজপত্র তৈরি করে তার সব স্বাক্ষর জাল করে হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল দাখিল করা হয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলার বর্তমান নির্বাহী অফিসার আবু হাসানাত মো. শহীদুল হক ইত্তেফাককে জানান, ‘আমি যোগদানের পর সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে নিশ্চিত হয়েছি, ১০টি কমিউনিটি সেন্টার ও ছয়টি ঘাটলা নির্মাণ হয়নি। বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পূবালী ব্যাংকের হিসাব খোলার বিষয়টিও একটি অনিয়মের মধ্য দিয়ে করা হয়েছে। যেখানে যৌথ হিসাব, সেখানে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সই থাকলেও ইউএনওর সই নেই। অথচ ঐ একাউন্টে সরকারি টাকা জমা হয়েছে।’
সারিকা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ঠিকাদার মো. শামীম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমাকে কলাপাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস থেকে ফোন করে বিল করার কথা বলা হয়েছে। আমি গিয়ে টাকা তুলেছি।’ তবে করোনার কারণে কোনো কাজ করতে পারেননি। পরে করে দেবেন বলেও তিনি জানান।
কলাপাড়া হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের একাউন্টস অফিসার মো. মোতালেব খন্দকার জানান, তারা কোনো প্রকার অনিয়ম করেননি। বিল-স্বাক্ষর পেয়ে বিল ছাড় করেছেন। তবে ঠিকাদার টাকা ফেরত দেবেন বলে তাকে জানিয়েছেন।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অমিতাভ সরকার এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে জানান, তিনি বিষয়টি জানতে পেরে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে কলাপাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) তপন কুমার ঘোষের ব্যবহূত দুটি মোবাইল নম্বরে বারবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠালেও তার কোনো উত্তর দেননি তিনি।
