ঢাকায় জলাবদ্ধতা ও প্রতিকার

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২০, ২১:২৭

পয়োনিষ্কাশনের ক্ষেত্রে একটি মহানগর কংক্রিটে আচ্ছাদিত হইয়া যাওয়া বড় কোনো সমস্যা নহে। হংকং, সিঙ্গাপুর হইতে শুরু করিয়া বিশ্বের বহু দেশের বহু মহানগরেই গায়ে গা মিশাইয়া উঠিয়াছে হাজার হাজার বহুতল ভবন। ঢাকার চাইতেও ঘনবসতিপূর্ণ শহর আছে বেশ কয়েকটি। কিন্তু লক্ষণীয়, ঐ সকল শহরে কখনো জলাবদ্ধতা তৈরি হয় না। বিশেষ করিয়া পানি উঠিয়া দিনের পর দিন আটকাইয়া থাকে না। ইহার কিছু কারণ রহিয়াছে। প্রথমত ঐ সকল মহানগরে আধুনিককালে যত ভবন ও স্থাপনা নির্মিত হইয়াছে, নূতন সড়ক তৈরি হইয়াছে, তাহা যত্নের সহিত পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে করা হইয়াছে। সেই সকল শহরে নদীনালাগুলিকে যত্নের সহিত রক্ষা করা হইয়াছে এবং শহরে প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত জায়গা সংরক্ষণ করা হইয়াছে। অধিকন্তু পানি নিষ্কাশনের জন্য যে ব্যবস্থা গৃহীত হইয়াছে তাহা ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় যথেষ্ট মজবুত হইয়াছে। দুঃখের বিষয় ইহার কোনোটাই ঢাকা শহরের জন্য করিয়া উঠা যায় নাই। যাহার ফলে বৃষ্টি বা সাময়িক বন্যা ঢাকার রাস্তায় পানি উঠিলে তাহা শহর ছাড়িয়া যাইবার পথ খুঁজিয়া পায় না। আমরা জানি, একটি শহর হইতে পানি নিষ্কাশনের জন্য কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক উভয় ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করিতে হয়। শহরের একটি রাস্তা, এমনকি গলি তৈরির সময় রাস্তার সঙ্গে পয়োনিষ্কাশনের পথ তৈরি করা হইয়া থাকে, যাহাকে প্রকৌশল ভাষায় ক্যাচপিট বলা হয়। এই ক্যাচপিটগুলির নিয়মিত যত্ন লইয়া সচল রাখিতে হয়। ক্যাচপিট দিয়া পানি যায় খালে এবং সেইখান হইতে পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে পানি গিয়া নদীতে পড়ে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার কোথাও বাধাগ্রস্ত হইলেই পানি নিষ্কাশনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

এই ঢাকা শহর আধুনিক হিসাবে গড়িয়া উঠাকালে বহু রাস্তায় ক্যাচপিট রাখিবার কথা ভাবা হয় নাই। ফলে নগর কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন সময় সড়ক ও গলি দিয়া ক্যাচপিট করিতে তিন গুণ বেগ পাইতে হইয়াছে। এখনো সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রহিয়াছে। সেই সঙ্গে অন্য বিষয়ও ভাবিতে হইবে। একটি আদর্শ শহরে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান থাকিবার কথা, যাহার মধ্যে কমপক্ষে ১০ শতাংশ জলাশয় থাকিবে বলিয়া নগর বিশেষজ্ঞদের মত। কিন্তু ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় খোলা জায়গা রহিয়াছে মাত্র ৪.৬১ শতাংশ। অস্বাভাবিকই বটে!

ইহার মধ্য দিয়াই আমাদের এখন যতটা সম্ভব স্বস্তিদায়ক পরিবেশ গড়িয়া তুলিতে হইবে। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা হইয়া দাঁড়াইয়াছে ক্যাচপিট কোন কর্তৃপক্ষের অধীন, নদী খাল কোন কর্তৃপক্ষের অধীন এবং পাম্প স্টেশনই-বা কোন কর্তৃপক্ষের অধীন তাহাদের ভূমিকা লইয়া! নিশ্চয়ই একই সংস্থার নহে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলির মধ্যে রহিয়াছে দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। মুশকিল হইল, অভিযোগ উঠিয়াছে, এই তিনটি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার। অবশ্যই একটির সঙ্গে আরেকটির সমন্বয় না থাকিলে জলাবদ্ধতার সমাধান আসিবে না। আমরা জানি যে, সেবা সংস্থাগুলোকে সরকার সীমিত সাধ্যের মধ্যেও বরাদ্দ দিয়া থাকে। সুতরাং সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে প্রত্যেকটি সংস্থা নিজ দায়িত্ব পালন করিলে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া সম্ভব। ইহাই আমাদের পরামর্শ। আর সংস্থাগুলি দায়িত্ব পালন সঠিকভাবে করিল কি না তাহা দেখিবার জন্যও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রহিয়াছে। সেই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনও কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।