সেবায় গতি আনতে প্রয়োজন প্রশাসনিক পদোন্নতি

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২০, ২১:৩৬

ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষ ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলাকে ২৩টি জেলায় ভাগ করে প্রথম ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর পদ সৃষ্টি করেন। পরে ১৮২১ সালে তাকে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট নামে আরেকটি পদ দেওয়া হয়। এটি জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। জেলার উন্নয়ন কর্মসমূহের সমন্বয়সাধনের জন্য পাকিস্তান আমলে District Magistrate বা Collector-এর জন্য আরেকটি পদ সৃষ্টি করা হয়, যার নাম ডেপুটি কমিশনার। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ হলে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এ পরিবর্তন সাধন করা হয়। বিচারিক কাজের জন্য জেলা পর্যায়ে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব আগের মতো ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের হাতেই অর্পিত রয়েছে এবং জেলার জনগণ এখনো জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তাদের সুখ-দুঃখের এবং আইনি সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ের জেএম শাখায় এ বিষয়ে জনগণকে সেবা দিয়ে থাকেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটগণ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি। জেলা প্রশাসক জেলাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রতিনিধি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান মতে বাংলাদেশ মন্ত্রিপরিষদ-শাসিত সরকার হওয়ায় জেলা প্রশাসকগণ জেলাতে জাতীয় সরকারের প্রতিনিধি। তিনি ঐ জেলার সবকিছুর জন্য জাতীয় সরকারের কাছে জবাবদিহি করেন। তিনি সরাসরি সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগকারী ক্ষমতাপ্রাপ্ত জেলার একমাত্র কর্মকর্তা। ডিউটিজ অব চার্টার অনুযায়ী জেলা প্রশাসক জেলার বিভিন্ন দপ্তর-সম্পর্কিত ২০০টি (কম-বেশি) কমিটির সভাপতি। জেলায় অবস্থিত প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অফিস জেলা প্রশাসনের অংশ এবং জেলা প্রশাসকের সাধারণ নিয়ন্ত্রণে (General Control) কাজ করে থাকে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সরকারের নজরে আনেন, জেলার সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে প্রতি ১৫ দিন অন্তর পাক্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (Fortnight Confidential Report—FCR) সরকারের কাছে প্রেরণ করেন। তার সুপারিশে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। জেলা প্রশাসনের ব্যাপক এ বিশাল কর্মযজ্ঞের সিংহভাগ কাজ করেন এ অফিসের সহকারীগণ। অফিস কর্মপ্রণয়ন অনুযায়ী বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে প্রাপ্ত পত্রগুলো অফিস সহকারীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকতার নির্দেশে তথ্য, তত্ত্ব ও উপাত্ত তৈরির মাধ্যমে মতামতসহ নোট উপস্থাপন করেন অফিস সহকারীগণ। জেলা প্রশাসনে কর্মী নিয়োগ দেওয়ার পর তাকে ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তা, মেধা, দক্ষতা ও বেশি শ্রম দিয়ে কাজ করতে হয়। জেলা প্রশাসনে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে গিয়ে কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে জ্ঞানের পরিধিও বাড়াতে হয়। এজন্য সহকারীদের বিধিবিধান নিয়ে প্রতিনিয়ত পড়তে হয়। যেহেতু অফিসের কাজে দক্ষতার ওপরই প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি ও ভাবমূর্তি নির্ভর করে, তাই প্রশাসনে কর্মরত সব কর্মচারীকে নিষ্ঠা, দক্ষতা ও গতি দিয়ে কাজ করেন। এ কথা সত্যি যে, সরকারের অন্যান্য দপ্তরের তুলনায় কাজের পরিধি, নোট উপস্থাপন, পত্র প্রস্তুতের ক্ষেত্রে ভাষার উত্কর্ষ ও বানান নির্ভুলতা, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে কর্মরত সহকারীর পারদর্শিতার সঙ্গে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অধীন, বিভিন্ন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, করপোরেশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কাজের মান গড়পড়তা হিসাবে মূল্যায়ন করা সমীচীন নয়। প্রশাসনে সহকারীরা যাদের সঙ্গে কাজ করে থাকেন তারা রাষ্ট্রের সর্্বোচ্চ পদ কেবিনেট সচিব হলেও অফিস সহকারীরা ১৬ নম্বর গ্রেডে নিয়োগ পেয়ে ২৫-৩০ বছর চাকরি করার পর উচ্চমান সহকারী পদে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। তাছাড়া সরকারের উচ্চপদের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য আনুপাতিক হারে পদ খালি থাকে; কিন্তু জেলা প্রশাসনের কর্মচারীদের জন্য এরূপ পদ খালি না থাকায় পদোন্নতিও হয় না। প্রত্যেক কালেক্টরেটের কমপক্ষে ১০০/১৫০ জন সহকারীর সাকুল্যে ১০-১৫ কমবেশি উচ্চমান সহকারী পদ আছে। ফলে এ পদে চাকরিতে জীবন শেষেও কোনো পদোন্নতি না পেয়ে একই পদ থেকেই অবসরে যাচ্ছেন। মূলত অফিস সহকারীগণের কাজ প্রশাসনিক। তাছাড়া কাজের সঙ্গে এসব পদের নামকরণেরও সার্থকতা নেই। যেমন জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে কর্মরত অফিস সহকারীগণ বেঞ্চ সহকারীর দায়িত্ব পালন করে থাকেন। অথচ কোথাও কোথাও এই কাজটি করেন প্রথম শ্রেণির পদধারী একজন বেঞ্চ অফিসার।

বর্তমানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বিধিমালা ছাড়াও রয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অফিস স্মারক-পরিপত্র। এসব পদের নাম ও বেতন স্কেল একই হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগ পদ্ধতি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিন্নতা রয়েছে। রয়েছে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম। সচিবালয়ের একজন কর্মচারী ১৬ গ্রেডে চাকরিতে যোগদান করে পাঁচ বছর পর ১০ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়ে যান। আর সচিবালয়, হাইকোর্ট, সংসদ, নির্বাচন কমিশন, পিএসসি ও মন্ত্রণালয়ের সংযুক্ত বিভাগগুলোয় ১৬তম গ্রেডে যোগদান করে অনেকে সহকারী সচিব হয়ে চাকরি থেকে অবসর নিচ্ছেন। ইসিতে তৃতীয় শ্রেণি থেকে এক লাফে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি প্রদানেরও নজির আছে। রাজউকে ইউডি পদে আট বছর চাকরি করলে অফিস সুপার পদে পদোন্নতি পাওয়া যায়। তাছাড়া বাংলাদেশ সচিবালয়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, হিসাব রক্ষণ অফিস, সিএমএম কোর্ট, কৃষি বিভাগ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, সংসদ সচিবালয় অফিসসমূহে সমপদের বিভিন্ন পদের পদবি ও গ্রেড পরিবর্তন করা হয়। শুধু ইউএনও, ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কর্মরত অফিস সহকারীগণ চাকরিতে জীবন শেষেও কোনো পদোন্নতি না পেয়ে একই পদ থেকেই অবসরে যাচ্ছেন। গত ২০১৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এক পরিপত্রে এমএলএসএস ও দপ্তরি—উভয় পদকে ‘অফিস সহায়ক’ পদে পরিবর্তন করা হয়। অফিস সহায়ক আর অফিস সহকারী পদবি সমার্থক শব্দ হলেও তাদের কাজের ভিন্নতা রয়েছে। এমএলএসএস পদের অর্থ সবার মনে রাখা সম্ভব নয় বলেই হয়তো অফিস সহায়ক নামটি মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছে। কিন্তু অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদবিরা কম্পিউটার অপারেট করে। কম্পিউটারের ওপর দক্ষতা না থাকলে অপারেট করা সম্ভব নয়। নামকরণ আলাদা তাত্পর্য বহন করে। ক্যাভেন্ডিস বলেছেন, ‘A beautiful name is better than a lot of wealth’ একটি সুন্দর নাম ধন-সম্পদের চেয়েও উত্তম। পরিশেষে বলা যেতে পারে, কোনো বিষয় বা বস্তুর নামকরণ জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। কাজের সঙ্গে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় কমিশনার অফিস, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে কর্মরত অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক/সমমান পদের নাম ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা’, ‘সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ ও ‘উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ পদবি নামকরণ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে মুজিববর্ষে তাদের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়ন করা হোক।

n লেখক :কেন্দ্রীয় সদস্য, বাংলাদেশ কালেক্টরেট সহকারী সমিতি (বাকাসস), ঢাকা এবং চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক