আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য আশ্রয়

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২০, ২৩:২৭

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারে জলবায়ু শরণার্থীদের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম পুনর্বাসন প্রকল্পের উদ্বোধনকালে বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তসহ দেশের সব জনগণের জন্য মুজিববর্ষে আবাসন নিশ্চিত করতে তার সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মুজিববর্ষ উদ্যাপন করছি। তার জন্মশতবর্ষে আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশে একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। প্রত্যেকটি মানুষকে যেভাবে পারি, একটি চালা হলেও আমরা করে দেব।’ প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজারে ‘খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প’ নামে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।

শেখ হাসিনা এ সময় বন্যা মোকাবিলায় তার সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি থাকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এবারে বন্যার প্রকোপটা একটু বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে আমাদের প্রস্তুতি আছে সেটা মোকাবিলা করার। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাদেরও আমরা ঘরবাড়ি তৈরির জন্য জমির ব্যবস্থা করে দেব। বাজেটে আমরা আলাদা করে টাকা বরাদ্দ        রেখেছি।’ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা মুজিববর্ষে একদিকে যেমন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়েছি তেমনি গৃহহারাদের ঘরবাড়ি করে দেব এবং যাতে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের জীবনমান উন্নত হয়।’

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে উপকূলবাসীকে বেশি করে গাছ লাগানোর পাশাপাশি দেশবাসীর প্রতি প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজের গতি খুব ভালো ছিল। কিন্তু এই করোনা ভাইরাস এসে সব জায়গাতেই একটা বাধার সৃষ্টি করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে অনুরোধ করব আপনারা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত যে নির্দেশনাগুলো রয়েছে সেগুলো মেনে চলবেন। মাস্ক পরে থাকবেন, যখন বাইরে যাবেন বা কারো সঙ্গে কথা বলবেন। নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপে গিয়ে ৭০টি ঘরবাড়িহারা পরিবারকে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাববধানে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার মধ্য দিয়েই তার সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের শুরু। এর পরে আশ্রয়ণটাকে আমরা একটি প্রকল্প হিসেবে নেই এবং সশস্ত্র বাহিনী তথা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরতদের এই ঘরগুলো করে দেওয়ার দায়িত্ব দেই। এগুলো ব্যারাক হিসেবে করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যাতে এসব কেউ চাইলেই বিক্রি করতে না পারে।’

তিনি বলেন, কক্সবাজারের উন্নয়নে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। সেখানকার মানুষের আগে চিংড়ি ও লবণ চাষ ছাড়া কোনো জীবনজীবিকাই ছিল না। কিন্তু এখন আমরা বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা নিয়েছি। একদিকে যেমন পর্যটন কেন্দ্রগুলো হবে, অন্যদিকে মানুষের সবরকম জীবনজীবিকার ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলও সেখানে করে দেব।

তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করতে গিয়ে দেখলাম জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৪ হাজার পরিবার সেখানে উদ্বাস্তু হয়ে আছে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম তাদের পুনর্বাসন করব এবং এই খুরুশকুল জায়গাটাও আমিই খুঁজে বের করেছিলাম।’ তিনি কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এখন ২০টি ভবন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বাকি ভবনগুলো নির্মাণ করা হবে। যেখানে সবকিছুই থাকবে, একটি আধুনিক শহর হিসেবেই খুরুশকুলকে গড়ে তোলা হবে।’

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ গণভবন থেকে এবং দশম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং এরিয়া কমান্ডার মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী কক্সবাজার প্রান্ত থেকে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এবং প্রেস সচিব ইহসানুল করিম গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রকল্পের একটি রেপ্লিকাও তুলে দেন। অনুষ্ঠানে প্রকল্পের ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয় এবং প্রকল্পস্থানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তিনজন উপকারভোগী তিনটি গাছের চারাও রোপন করেন। প্রধানমন্ত্রী পরে ভিডিও কনফারেন্সে উপকারভোগী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মত বিনিময় করেন।

কক্সবাজারের খুরুসকুলে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠান স্থলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পরেই প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ফ্ল্যাট প্রাপ্ত পরিবারগুলোর হাতে এগুলোর চাবি তুলে দেওয়া হয়। এদিন খুরুশকুলের বাঁকখালী নদীর তীর ঘেঁষা বৃহত্ এ প্রকল্পে নির্মিত ২০টি পাঁচ তলা ভবনে ৬০০টি পরিবার নতুন ফ্ল্যাট পায়। প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে থাকছে ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ফ্ল্যাট। পর্যায়ক্রমে ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার এখানে ফ্ল্যাট পাবে।

এর আগে বুধবার প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘প্রতিটি পরিবার এখানে ১০০১ টাকার বিনিময়ে একটি ৪৫৬ বর্গফুটের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ফ্ল্যাট পাবে। সেখানে প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক র্যাম্প, সোলার প্যানেল, বিশুদ্ধ পানির সুবিধা, বিদ্যুত্, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং গ্যাস সিলিন্ডার সম্বলিত চুলার ব্যবস্থা থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পে ২৫৩ দশমিক ৫৯ একর জমির ওপর মোট ১৩৯টি ৫ তলা ভবন হবে। এগুলোর ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

প্রকল্পে আবাসন, পর্যটন ব্যবস্থা, শুটকি পল্লী বা ‘শুটকি মহল’ এবং সবুজ বনায়নসহ চার ধরনের সুবিধা থাকবে বলেও তিনি জানান। প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘এটাই দেশের সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্প।’

প্রকল্পের নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর দশম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং এরিয়া কমান্ডার মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী পৃথকভাবে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত নয়নাভিরাম একটি জায়গা। এ জায়গাটিকে সুরক্ষিত করার জন্য মাটিকে অনেক উঁচু করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনের নিচের তলায় কোনো ফ্ল্যাট রাখা হয়নি। ফলে, ঘূর্ণিঝড় হলে জলোচ্ছ্বাসের পানি ঢোকারও আশঙ্কা নেই।’