ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মহাযজ্ঞ চলছে পৃথিবীর অনেক দেশে, অনেক বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশেষজ্ঞগণ পরামর্শ দিচ্ছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরামর্শ দিচ্ছে— কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও বাজারজাতকরণের আগে মানুষকে সাবধানে রেখে করোনার ছোবলকে যতটা পারা যায় ঠেকিয়ে রাখতে হবে। তবে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে না। তাকে পৌঁছে দিতে হবে প্রতিটি দেশের মানুষের কাছে। তার পরও প্রশ্ন থাকবে—একটি ভ্যাকসিন মানুষকে কত দিন আক্রান্ত থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হবে। সাধারণত ভ্যাকসিনের মেয়াদ থাকে এক বছর পর্যন্ত। সুতরাং সেই ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনটি প্রতি বছরই পৃথিবীর সমস্ত মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। অর্থাত্ প্রতি বছরই ভ্যাকসিন উত্পাদনের ব্যবস্থাটি চলমান থাকবে, যে পর্যন্ত করোনা তার নিজ গুণে আমাদের ছেড়ে চলে না যায়। একটি আশার কথা, ভ্যাকসিন হয়তো সবার জন্য প্রয়োজন না-ও হতে পারে। সুস্থ-সবল কম বয়সি মানুষ হয়তো ভ্যাকসিন ছাড়াই করোনা আক্রান্তের পর সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। ভ্যাকসিন বিশেষভাবে প্রয়োজন অধিকতর বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ কিংবা দুর্বল লোকদের জন্য।
যদিও করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য প্রায় ১৪০টি প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে এবং এর মধ্যে ১৩টি প্রতিষ্ঠান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেতে সমর্থ হয়েছে। তবে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সবচেয়ে অগ্রসর ভূমিকায় আছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গত এপ্রিল মাসে ৫০০ জন আক্রান্ত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তাদের প্রথম স্তরের টেস্টটি করতে সক্ষম হয়েছিল। তার আগে এই বিশ্ববিদ্যালয় বানরের ওপর ভ্যাকসিন ব্যবহার করে সফলতা লাভ করে।
তৃতীয় স্তরে পৌঁছে গিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানি ব্রাজিলের সঙ্গে ব্রাজিলে স্থানীয়ভাবে এই ভ্যাকসিনটি প্রস্তুত করার লক্ষ্যে ১২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি ইতোমধ্যে সম্পাদন করেছে। ব্রাজিলের স্বাস্থ্য বিভাগ ঘোষণা দিয়ে রেখেছে যে, তারা মোট ৩০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করবে, যার অর্ধেক হবে ২০২০-এর ডিসেম্বরের মধ্যে এবং বাকি অর্ধেকটা হবে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার তিনটি ওষুধ কোম্পানিকে তাদের তৃতীয় স্তরের পরীক্ষা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে অনুদানের জন্য নির্বাচিত করেছে। তারা এই মাসে অনুদান প্রদান করবে মডার্নাকে, আগস্ট মাসে করবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকাকে এবং সেপ্টেম্বরে করবে ফাইজার কোম্পানিকে।
সবকিছু ঠিকঠাকমতো এগিয়ে গেলে আমরা এই মুহূর্তে আশা করতেই পারি যে, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাস্ট্রাজেনেকার যৌথ উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না খুব শিগিগরই আমাদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক সংবাদ নিয়ে আসবে। তার জন্য আর খুব বেশি বিলম্ব করতে হবে না। এ বছরের শেষের দিকেই এই শুভ সংবাদটি পৃথিবীর মানুষকে অনেক বড় প্রশান্তির জায়গা উপহার দিতে পারে। এমনটি হলে আমরা অন্তত একটু আশ্বস্ত হতে পারব যে, করোনাকে ঠেকাতে আমাদের ভ্যাকসিন আছে। তবে প্রতিটি দেশের সরকারকে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, এবারের ভ্যাকসিনের প্রয়োজন কোনো বিশেষ দেশের জন্য নয়—এটির প্রয়োজনীয়তা আছে ২১৮টি দেশের সকলেরই এবং প্রতিটি দেশের সমস্ত মানুষের জন্য না লাগলেও অধিকাংশ মানুষের জন্যই ভ্যাকসিনের ব্যবহার আবশ্যকীয়।
জুলাই মাস চলছে। ভ্যাকসিনটি এখনো চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করতে পারেনি। আমাদের অনুমান ও বিশ্বাস, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরীক্ষাটি শেষ হবে। যদি ধরে নিই, এ বছরের মধ্যেই অনুমোদনের কাজটি সম্পন্ন হবে—তার পরও ভ্যাকসিনটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য গ্রামে গ্রামে পৌঁছাতে আরো একটু সময় লাগবে। বাংলাদেশে বর্তমানে আক্রান্তের মাত্রা বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে, হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সার সুযোগ সীমিত হচ্ছে। এদেশের মানুষকে এ বছরের শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে হবে। ভ্যাকসিন প্রদানের আগে পর্যন্ত তাকে বেঁচে থাকতে হবে। যারা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার কাজটি করছেন, তারা দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করছেন। বিলিয়ন বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করা হচ্ছে এই গবেষণায়। তাদের কাজ তারা করছেন। এখন আপনার পালা। আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বটুকু আপনার নিজের। আপনি যদি মাস্ক পরিধান করেন, ঘনঘন সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেন এবং শারীরিকভাবে অন্য মানুষের সঙ্গে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখেন তাহলে আপনি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন। অনেক বড় প্রশ্ন হলো—আপনি তা করবেন কি?
n লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা
