অধ্যক্ষ,কাজী শরীফ উদ্দিন,সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ,ঢাকা
সারাবিশ্ব আজ করোনা নামক অদৃশ্য শক্তির সাথে লড়ছে। বাঁচা-মরার শৃঙ্খলে বন্দি জন-জীবন। অবিরাম চলছে মুক্তির সকল চেষ্টা। দাঁড়িয়ে আছি জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে, যেখানে জন-জীবন স্থবির, মুখ থুবরে পড়ছে মানুষের ভবিষ্যত ভাবনার রঙিন স্বপ্নগুলো। শিক্ষাব্যবস্থাও তার বাইরে নয়। মানুষকে মানুষ করার জন্য, সমাজ থেকে সকল অসত্যের কালিমা দূর করার জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। কোনো জাতির উন্নতি সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। শিক্ষাই মানুষকে আলোকিত করে; করে উন্নত। তাই জীবন মরণের ক্রান্তিলগ্নে শিক্ষাব্যবস্থার স্থবিরতা দূর করতে শিক্ষা চিন্তাবিদ, কর্তাব্যক্তিদের উদ্যোগের কমতি নেই। ফলশ্রুতিতে শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে নানা পদ্ধতি।
শিক্ষায় দূরশিক্ষণ পদ্ধতি একটি উদ্ভাবন বলে আমাদের মনে হয়েছে। অতীতের নাইট স্কুল বা নাইট কলেজে শিক্ষার বিকল্প হলো দূরশিক্ষণ। আমাদের দেশের উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও এই ব্যবস্থা রয়েছে। পৃথিবীর বহু দেশে দূরশিক্ষায় ক্লান্ত হয়ে তারা ভার্চুয়াল শিক্ষা প্রবর্তনে উদ্যোগী হয়েছে। কোথাও তা সম্ভব না হলে (যেমন- বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায়) মিশ্র পদ্ধতি চালু করেছে। এই পদ্ধতির তাত্ত্বিক বিষয়গুলো অনলাইনে আর ব্যবহারিক শিক্ষার পরীক্ষাগুলো মুখোমুখি পদ্ধতিতে নেয়া হচ্ছে। এ শতাব্দির প্রথম দিকেও ভার্চুয়াল শিক্ষা, শিক্ষার্থী ভর্তি ও শিক্ষার্থীর ফি আদায়, পাঠদান ও মূল্যায়ন নিয়ে বহু প্রতিবন্ধকতার কথা বলা হয়েছে। সৌভাগ্য যে, একমাত্র মূল্যায়নে বিশুদ্ধতা আনা ছাড়া অন্য বিষয়গুলোর চমত্কার সমাধান এসে গেছে। এখন সেশনজট আমাদের উত্তরবঙ্গের মঙ্গার মতো হয়ে গেছে। হোস্টেলে সিট নিয়ে মারামারি-কাড়াকাড়ি আর আর্থিক বিনিময় বিলোপ হবে যদি অনলাইন ক্লাস ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। সময়ের দুষ্প্রাপ্যতার কথাও উচ্চারিত, চাকুরি করে বা সন্তান লালন করে স্বামী বা স্ত্রীকে পালাক্রমে চাকরির পাশাপাশি শিক্ষা গ্রহণ করতে অনলাইন শিক্ষাক্রম অপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে আমরা করোনাকে প্রতিহত বা আত্মস্থ করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল রাখতে অস্ত্র হিসেবে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্প্রতি হাত দিয়েছি। ইতোমধ্যে অনলাইন কার্যক্রমে সহায়ক গুগল থেকে শুরু করে মুডল প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। বিদ্যুত্ ব্যবস্থার মাত্র ৪৩ ভাগ ব্যবহূত হচ্ছে কিংবা ব্রডব্যান্ড সুবিধা পর্যাপ্ত অব্যবহূত রয়েছে। এগুলোকে কাজে লাগিয়ে আমাদের বর্তমান অবস্থায় আমরা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারি। অভিযোগ আছে এ ব্যবস্থা শুধু ধনীর সন্তানের জন্য উপযোগী হলেও মানবিক স্পর্শের অনুপস্থিতিটা সবার জন্য একটা বড় অন্তরায়। অনলাইন ব্যবস্থায় যাতে মানবিক স্পর্শ সৃষ্টি করা যায়, তার ব্যবস্থাও এসে গেছে। মিথস্ক্রিয় অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার কিছুটা উপকরণও তার মধ্যে সফলভাবে সংযোজিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট নিরসনের কিছু উপায় চিন্তা করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ল্যাপটপ, স্মার্টফোন বা অন্যান্য উপকরণ সরবরাহের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবস্থা হচ্ছে। বর্তমানে যা আছে তারও সদ্ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অনেক শিক্ষার্থী নানা অজুহাতে পরীক্ষা পেছাতে চাইত বা পরীক্ষা দিতে চাইত না। আমরা তো জানতাম বাঙালির ডান ও বাম হাত ছাড়া আরও একটি হাত আছে, যার নাম অজুহাত। আমরা এই অজুহাতের সীমিত প্রতিষেধক বের করেছিলাম। ছাত্ররা যখন পরীক্ষা দিতে অপারগতা জানাল, তখন আমরা পরীক্ষায় ওপেন বুক বা খোলা বই ব্যবহারের সূচনা করলাম। এ ব্যবস্থায় পরীক্ষার্থীর প্রশ্নোত্তরে যতটা পারে বই দেখার সুযোগ থাকে। ছাত্ররা এটাকে অনেক কঠিন পরীক্ষা বিবেচনায় কমিটিং টু মেমোরি অ্যান্ড ভমিটিং ইন দ্য ক্লাসরুম প্রক্রিয়ায় ফেরত এলো। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা অনেকেই বলেছেন, মূল্যায়নের গতানুগতিক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখলে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম অনেকটা ব্যর্থ হবে; কিন্তু বিকল্প হিসেবে উপস্থাপনা, ছোট আকৃতির রচনা বা মুখোমুখি প্রশ্নের জবাব সংযোজিত হলে মূল্যায়ন সমস্যার কিছু সমাধান পাওয়া যাবে। নকল প্রবণতা বা অন্যের কাজ নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে যেসব সংস্থা শিক্ষার মান পরীক্ষা করে এবং যাদের মূলায়নের ভিত্তিতে চাকরির বাজারে চাকরিপ্রাপ্তির হেরফের ঘটছে, তারাও এই অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইতিবাচক মূল্যায়ন করছে। করোনার কারণে গত চার মাস ধরে বন্ধ রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্থগিত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। প্রকট হচ্ছে সেশনজটের আশঙ্কা। পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। সংকট সমাধানে অনলাইন ক্লাসের ব্যাপ্তির পরিকল্পনা করছে সরকার।
করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার গত ১৬ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। এর ফলে পিছিয়ে যায় এইচএসসি পরীক্ষাও। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা কার্যক্রম যাতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সে লক্ষ্যে প্রথমে মাধ্যমিক স্কুলের জন্য সংসদ টিভিতে ক্লাস পরিচালনা শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। এরপর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উদ্যোগে শুরু হয় প্রাথমিকের ক্লাস মঙ্গলবার (৩০ জুন) যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে এ তথ্য জানা যায়। সম্পাদকীয়তে জানা যায়, করোনার প্রভাবে শুধু শিক্ষার্থীই নয়, শিক্ষকরাও বিপাকে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেসরকারি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিও বন্ধ। কারিগরি শিক্ষার প্রসারে দেশে বেসরকারি উদ্যোগে ৫৫৩টি বেসরকারি পলিটেকনিক গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু শিক্ষার্থীদের বেতনের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের বেতন-ভাতার সংস্থান হচ্ছে না।
স্বাভাবিক পড়াশোর সমস্যা কিছুটা লাঘব করতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ সংসদ টেলিভিশনে প্রচার করা হচ্ছে। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে বা পাঠ দিচ্ছে। তবে সেটা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের যথাযথ বিকল্প নয়। অনলাইনে বা টিভি সম্প্রচারে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট রাখা হয়তো সম্ভব হচ্ছে: কিন্তু করোনাকালে শিক্ষা কার্যক্রম যে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে তা অস্বীকার করা যায় না। উচ্চশিক্ষার ৩২ লাখ শিক্ষার্থীর ২৮ লাখই এখনও পড়ালেখার বাইরে। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বড় ধরণের সেশনজটের আশঙ্কা রয়েছে। ১৭ মার্চ থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। ৬ আগস্ট পর্যন্ত এ ছুটি বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এরই মধ্যে উচ্চশিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগবে। করোনার বিদ্যামান পরিস্থিতিতে ৬ আগস্টের পরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্রুত খোলার সম্ভাবনা কম। ছুটি আরও বাড়তে পারে। এর ফলে বড় রকমের সেশনজটজনিত সমস্যায় পড়তে হবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। বর্তমানে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করছে প্রায় ৩২ লাখ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় তিন লাখ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অধ্যয়ন করছে সাড়ে ২৪ লাখ শিক্ষার্থী। আর সেরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে প্রায় পৌনে চার লাখ শিক্ষার্থী। করোনাকালে শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোকে অনলাইনে ক্লাস শুরুর তাগিদ দেয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর সরকারি কলেজগুলোতে অনলাইনে ক্লাস নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু বড় কিছু সরকারি কলেজ ছাড়া অন্যরা অনলাইনে ক্লাস শুরু করতে পারেনি। কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিভাগ অনলাইনে শতভাগ শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। সময় গড়াচ্ছে, বিকল্প ভাবনা হবে বৈকি। কিছু বাস্তব সমস্যা অবশ্যই আছে, যেমন-বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর গ্রামে-মফস্বলে অবস্থান করা, অনলাইন ক্লাসের সামগ্রী সংকট, ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য, কিছু শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন না থাকা ইত্যাদি। সরকারের যে অবকাঠামো রয়েছে তাতে এখন আর এ সমস্যা থাকার কথা নয়: বরং বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনলাইনে ক্লাস নিতে অনীহা এবং ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা।
এ অবস্থায় সেশনজট এড়াতে শিক্ষা বিভাগকে তত্পর হতে হবে: সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পুরোদমে চালাতে হবে। অবস্থা বুঝে উপায় অবশ্যই বের করতে হবে। এইচএসসিতে শিগগিরই হয়তো ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হবে। ভর্তির ক্ষেত্রে নিজ এলাকার প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে করোনার সময়েও শিক্ষার্থীরা ঝামেলাবিহীন প্রতিষ্ঠান যেতে পারে। বৈশ্বিক এই সংকটকালে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থাই হতে পারে শিক্ষা সংকট থেকে মুক্তির সোপান। সব রকম প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন যুগোপযোগী পরিবর্তন। অনলাইন ক্লাস পদ্ধতিই হতে পারে বৈশ্বিক মহামারীর দানবীয় থাবা থেকে শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষার একমাত্র হাতিয়ার।
