জয় হোক আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২০, ২১:৪৫

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। একদলকে আমরা আশাবাদী মানুষ আরেক দলকে আমরা নৈরাশ্যবাদী মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জন মিলটন বিশ্বাস করতেন, মানুষ কখনো পরাজিত হতে পারে না। এর মাধ্যমে তিনি আশাবাদী মনের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। এটি তিনি কেবল মুখে বলেননি, নিজের জীবনে প্রয়োগও করেছেন। ১৬৫২ সালে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেলেন মিলটন। অন্ধ বলে জীবনকে থামিয়ে দেননি, হতাশায় নিমজ্জিত হননি। চোখের শক্তি না থাকলেও চিন্তার শক্তিকে সক্রিয় রেখেছিলেন। অন্ধ অবস্থাতেই মিলটন ‘প্যারাডাইস লস্ট’ আর ‘প্যারাডাইস রিগেইন্ড’ নামে দুই কালজয়ী মহাকাব্য রচনা করলেন। মিলটনের মুখ থেকে উত্সারিত জাদুকরী শব্দকে কন্যা দিবোরা হাতে লিখে লিখে মহাকাব্যকে বাস্তবে রূপ দিলেন। বিস্মিত হলো পৃথিবী। চোখের দৃষ্টির চেয়ে মানুষের চিন্তার দৃষ্টি যে অনেক বড় তা আবার প্রমাণিত হলো। ১৬৬৭ সালে মহাকাব্য দুটো প্রকাশিত হলে ইংল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের সীমা ছাড়িয়ে পৃথিবীর মহাসম্পদে পরিণত হয়। ইতিহাসের পাতায় চিরকালের মতো নিজের নাম লেখালেন এই ইতিবাচক চিন্তাশক্তির মানুষটি। তিনি বোঝাতে সক্ষম হলেন কল্পনাশক্তির সঙ্গে এই চিন্তাশক্তির একটা যোগসূত্র আছে। অনেকটা মানুষের জীবনের জটিল সরল অঙ্কের মতো এই সমীকরণটি। আশাবাদী মন সব সময় ইতিবাচক স্বপ্ন দেখে। এই ইতিবাচক স্বপ্ন মানুষের মধ্যে ইতিবাচক কল্পনার ইটের পরে ইটের গাঁথুনির মতো সৃষ্টিশীল মনোভাব গড়ে তোলে। আশাবাদী মানুষ যে কোনো নতুন সৃষ্টি ও পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা রাখে। যে কোনো ক্ষেত্রেই নতুন নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি আশাবাদী মানুষের হাত দিয়েই ঘটে। এ হাত ইতিবাচক চিন্তার অদৃশ্য হাত। মানুষের হাত কখনো বড় হয় না, মানুষের আশাবাদী চিন্তা ও কল্পনাশক্তির হাতে গড়া সৃষ্টি তার হাতকে বড় করে। পৃথিবীর অনেকগুলো উপাদানের মধ্যে বিজ্ঞানকে এখানে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিজ্ঞান অনেকটা মানুষের দেওয়া পরীক্ষার মতো। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো—বিজ্ঞান বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রথমে ফেল করেছে। ফেল করতে করতে এক দিন পাশ করেছে। বিজ্ঞানীরা নতুন সৃষ্টিতে বারবার বিফল হলেও নৈরাশ্য দ্বারা প্রভাবিত হননি, বরং এক একটা ব্যর্থতা এক একটা অবিস্মরণীয় সফলতার জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞানীরাই বলছেন, ‘পরীক্ষায় ফেল’ না করে বিজ্ঞান কখনো পাশ করতে পারেনি। টমাস আলভা এডিসন যখন বৈদ্যুতিক বাল্ব তৈরির কাজ করছিলেন তখন যে ম্যাটেরিয়ালের মাধ্যমে বেশি আলো পাওয়া যাবে তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তিনি একের পর এক ফিলামেন্ট ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করলেন। কিন্তু দুই হাজারেরও বেশি ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করার পরও ইতিবাচক কোনো ফলাফল পেলেন না। অর্থাত্ যে পরিমাণ আলো দরকার তা পেলেন না। এডিসনের সহযোগী বিজ্ঞানীরা বললেন, আমরা গবেষণায় ব্যর্থ হয়েছি, সফল হতে পারিনি। কিন্তু এডিসন বললেন অন্য কথা।

তিনি বললেন, আমরা গবেষণায় সফল হয়েছি। আমাদের সফলতা হচ্ছে— গবেষণার মাধ্যমে এখন আমরা আগামী প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জানাতে পারব—তাদের আর আমাদের ব্যবহূত ম্যাটেরিয়ালগুলো পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন নেই। এখন তারা এই ম্যাটেরিয়ালগুলো ব্যাড দিয়ে নতুন কোনো ফিলামেন্ট ম্যাটেরিয়ালের সন্ধান করতে পারে। একইভাবে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, মনস্তত্ত্ব সব সব জায়গাতেই আশাবাদী চিন্তাধারার চর্চা হওয়া দরকার। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এই আশাবাদী চিন্তাকে কতটা সময় ধরে রাখা সম্ভব যেখানে মানুষের মধ্যে নৈরাশ্যবাদী মনোভাব গড়ে উঠেছে? ধীরে ধীরে মানুষ নিরাশাবাদী দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আশাবাদী দর্শনকে পরিত্যাগ করছে। কিন্তু কেন এমনটা ঘটছে। তার কারণগুলো হয়তো আমাদের জানা আছে, সমাধানের পথও হয়তো আছে কিন্তু নৈরাশ্যবাদী উপাদান সমূহ আমাদের সে সমস্যাগুলোর সমাধানে আগ্রহী করছে না। কেননা আমরা আশাবাদকে জয় করার আগেই পরাজিত হবার ও পিছিয়ে পড়ার মানসিকতাকে ধারণ করেছি। কিংবা যে নেতিবাচকতার নিজের কোনো স্বার্থ নেই, সেখান থেকে আমরা নিজেদের সরিয়ে রাখছি। এর ফলাফল যে কারো জন্যই ইতিবাচক হবে না সেটি ভেবে দেখছি না। ৬০ বছর আগে আমেরিকার ঔপন্যাসিক জেমস ব্রান্চ ক্যাবেল, দুইটি বিপরীতধর্মী দর্শনবাদকে এইভাবে বর্ণনা করেছিলেন: ‘আশাবাদীরা মনে করেন যে সম্ভাব্য সমস্ত মানব সমাজের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম পরিস্থিতিতে আমরা বাস করি; আর নৈরাশ্যবাদী এই সত্যকে ভয় পান।’ এ কথাই যদি সত্য হয় তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচক করতেই হবে। কারণ নৈরাশ্যবাদীতাকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে আগামী প্রজন্মকে পিছিয়ে দেওয়া। অনেকেই বলে থাকেন গ্রাফোলজি থেকে মানুষের চরিত্র বোঝা যায়। চরিত্রের সঙ্গে মানুষের মনোভাবও হয়তো বোঝা যায়। মানুষ আশাবাদী না নিরাশাবাদী? গ্রাফোলজি শব্দটা দুর্বোধ্য মনে হলেও মানুষকে বোঝার এটা একটা সহজ সরল প্রক্রিয়া। অনেকেই এটাকে বিজ্ঞান হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। তবে গ্রাফোলজির যারা চর্চা করেন তাদের গ্রাফোলজিস্ট বলা হয়। এটার পক্ষে তাদের অনেক যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। গ্রাফোলজিস্টরা দেখিয়েছেন, একজন নর্তকীর স্বাক্ষরে নৃত্যভঙ্গিমার শৈলী খুঁজে পাওয়া যায়, বিজ্ঞানীর স্বাক্ষরে সুসংবদ্ধ মনোভাবের পরিচয় মেলে। আবার জনপ্রিয় মানুষেরা স্বাক্ষর করে থাকেন কলমের ওপর চাপ দিয়ে খুব বড় বড় অক্ষরে ও তাদের অক্ষরের টানগুলো হয় বড় হয়ে তা পাতার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে চলে যায়। এই বিশ্লেষণগুলো যে সবক্ষেত্রে সত্য তা নয়। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও দেখা যায়। নেপোলিয়নের স্বাক্ষর প্রথম জীবনে ছিল অনেকটা ছড়ানো। ক্ষমতায় থাকাকালীন স্বাক্ষর কিছুটা ছোট আকৃতির হয়ে যায়। ১৭৯১ সালে তরুণ নেপোলিয়নের স্বাক্ষরের সঙ্গে ১৮০৫ সালের ফ্রান্সের শাসক নেপোলিয়নের স্বাক্ষর কাছাকাছি রেখে গ্রাফোলজিস্টরা এই পার্থক্য প্রমাণ করে দেখান। যখন নেপোলিয়নের হারতে থাকেন তখন তার স্বাক্ষরের মধ্যে আগের সেই আশাবাদী মনোভাব ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে আর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার স্বাক্ষর খুব ছোট, দুর্বোধ্য ও হিজিবিজি আকৃতিতে পরিবর্তিত হয়। মানুষের স্বাক্ষরের গতি প্রকৃতি দেখেও একজন মানুষের আশাবাদ ও নিরাশাবাদের মনোভাব পর্যবেক্ষণ সম্ভব। দীঘদিন যাচাই ও পর্যবেক্ষণ করে গ্রাফোলজিস্টরা বলছেন নৈরাশ্যবাদীদের স্বাক্ষরের অক্ষরগুলো কৌণিকভাবে নিচের দিকে নেমে থাকে। অক্ষরগুলো হয় ভাঙাচোরা ও অগোছালো।

অন্যদিকে আশাবাদী মানুষদের স্বাক্ষর ওপরের দিকে টান করা স্পষ্ট, পরিষ্কার, গোছানো ও সৃষ্টিশীল হয়। অক্ষরগুলোর মধ্যে গোলাকার ভাবের প্রকাশ থাকে। নিজের মনোভাবকে যাচাই করার এমন অনেক পদ্ধতি হয়তো পৃথিবীতে আছে কিন্তু সারা দেশের মানুষকে যাচাই করে তাদের মনোভাবকে আশাবাদী করার পদ্ধতি নিয়ে আমাদের গবেষণা করতে হবে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রধান গবেষক ডা. নাটালি মার্চেন্ট, অতীতের নেতিবাচক ঘটনা ও ভবিষ্যত্ নিয়ে একটি গবেষণা করেন। সেখানে ৩৫০ জন ব্যক্তিকে দীর্ঘ দুই বছর ধরে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তাদের এক তৃতীয়াংশের ব্রেন স্ক্যানে তাউ ও বেটা অ্যামাইলয়েড নামের দুইটি প্রোটিনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, যারা বেশি সময় নেতিবাচক চিন্তা নিয়ে পার করেন তাদের মাঝে এ দুইটি প্রোটিন তৈরি হয়। এ সব দেখে বলা হচ্ছে, চার বছর সময়কালে আশাবাদী মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে নৈরাশ্যবাদীদের স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানগত চিন্তার সক্ষমতা হ্রাস করে। সুতরাং বিজ্ঞান বলছে আমাদের আশাবাদী হতে। পথটা ও অভিজ্ঞতাটা মানতে না চাইলেও দৃষ্টিভঙ্গিটা আমাদের ইতিবাচকভাবেই বদলাতে হবে। তবেই আশাবাদী মন নিরাশাকে পরাভূত করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিবে।

n লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর