৭৬ শতাংশ কমেছে
সঞ্চয়পত্র বিক্রি
রেজাউল হক কৌশিক
মহামারি করোনা ভাইরাসের নেতিবাচাক প্রভাবে মানুষের হাতে টাকা কমে যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। আর যারা বেসরকারি চাকরি করছেন তাদেরও অনেকের বেতন কমে গেছে। কমিশন বেজড চাকরিজীবীদের অবস্থা তো খুব খারাপ। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের যা সঞ্চয় ছিল তা ভেঙে খাওয়া শুরু করেছে। মানুষ যেসব জায়গায় সঞ্চয় করে তার মধ্যে অন্যতম হলো সঞ্চয়পত্র। গত তিন মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে। উলটো সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর ঘটনাও বহু।
অর্থনৈতিক সংকটের আগে থেকেই সরকারের নানারকম শর্ত আরোপে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমছিল। বিদায়ী অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ১১ কোটি টাকা। একই সময়ে আগের অর্থবছরে (২০১৮-১৯) এর পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে ১১ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে ৩৫ হাজার ৭০২ কোটি টাকা, যা ৭৬ শতাংশের কিছুটা বেশি। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার প্রাদুর্ভাবে অনেকে বেকার হয়েছেন। আবার অনেকের চাকরি আছে কিন্তু বেতন পাচ্ছেন না। এমতাবস্থায় সঞ্চয় তো দূরের কথা উলটো জমানো অর্থ ভাঙছেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা বলেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত করতে সুদহার না কমিয়ে নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছে সরকার। এসব কারণেও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমার কারণ মূলত দুটি। একটি হচ্ছে, ধনী লোকেরা এখন আর সঞ্চয়পত্রে বেশি টাকা রাখতে পারছে না। আর করোনার কারণে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্র কেনার সক্ষমতা হারিয়েছে। মানুষ এখন খুব কষ্টের মধ্যেই জীবন যাপন করছে। এতে তাদের সঞ্চয়ে হাত দিতে হচ্ছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রধানত দুই কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে। আইনগত কড়াকড়ি এবং মহামারি করোনা পরিস্থিতি।
বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আয়করের হার বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া আরো কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়ায় সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। এখন সহজে সঞ্চয়পত্র কেনা যায় না। করোনার আঘাতে বিপর্যস্ত অনেকে সঞ্চয় ভাঙছেন।
জানা গেছে, গত কয়েক বছর সঞ্চয়পত্রের অস্বাভাবিক বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় এ খাতের ওপর বেশ কয়েকটি বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। আগে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য কোনো ক্রেতাকে কর শনাক্ত নম্বর বা ই-টিআইএন জমা দিতে হতো না। কিন্তু এখন ১ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে তা বাধ্যতামূলক।
এছাড়া সঞ্চয়পত্রে বড় বিনিয়োগে কঠোর হয়েছে সরকার। ভবিষ্যত্ তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ নেই। অনলাইনে মনিটর করায় সীমার অতিরিক্ত বা একই নামে বিভিন্ন জায়গা থেকে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ নেই। এসব কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের (জুলাই-মে) ১১ মাসে ৫৭ হাজার ৮০৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে।
এর বিপরীতে মূল পরিশোধ হয়েছে ৪৬ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। মূল অর্থ পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ নিট বিক্রি হিসেবে গণ্য হয়। সেই হিসেবে আলোচিত সময়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ১১ হাজার ১১ কোটি টাকা। একই সময়ে আগের অর্থবছরে (২০১৮-১৯) সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা এবং নিট বিক্রি ছিল ৪৬ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা।
সে হিসাবে আগের অর্থবছরের তুলনায় বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৯-২০) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি কমেছে ৭৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আর একক মাস হিসেবে চলতি বছরের মে মাসে ৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে মূল ও মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। ফলে মাসটিতে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ৪৩০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
এদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ায় সাত বছর পর সংশোধিত বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ অর্ধেকের বেশি কমিয়ে এনেছে সরকার। গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র খাতে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ২৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত বাজেটে এটি কমিয়ে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাত্ ১৫ হাজার ৭৬ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বিশাল ঘাটতি মেটাতে এবার সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার।
