আরো দুই দিন বাড়বে বন্যার পানি

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২০, ২২:৫৪

মৌসুমের তৃতীয় দফা বন্যায় দুর্গত অধিকাংশ জেলায় নদনদীতে পানি বাড়ছে। এই পানি বৃদ্ধি আরো দুই দিন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। গতকাল শনিবার দেশের ১৭টি নদনদী ২৭টি স্থানে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে মধ্যাঞ্চলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুর্ভোগ বাড়ছে বানভাসিদের। এ দিকে সিরাজগঞ্জে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি যমুনায় বিলীন হয়েছে। পদ্মায় তীব্র স্রোতের কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হয়। এতে দুই পাড়ে পশুবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ জটের সৃষ্টি হয়।

বন্য পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ছে, এটা কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গা ও পদ্মা নদীর পানিও বাড়তে পারে। ঢাকা জেলার আশপাশের নদীর পানি আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়তে পারে। সুমদ্রে জোয়ারের কারণে দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যার পানি কমতে দেরি হতে পারে। আর জোয়ারে সমস্যা না হলে অগাস্টের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে দেশের সব জায়গা থেকে বন্যার পানি নেমে যেতে পারে।

বন্যার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী দুই দিনে মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ঢাকা, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল এবং নওগাঁ জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে, তারপর পানি কমতে শুরু করবে। এছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জ জেলায় বন্য পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা জানান, পদ্মায় পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ফেরি চলাচলে বেশি সময় লাগছে। গতকাল বিকালে দৌলতদিয়া ঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রায় ৩ শতাধিক যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক নদী পাড়ের অপেক্ষায় ছিল। অপরদিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড় ট্রাফিক পুলিশ বক্স থেকে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রায় ৪ কি. মি. এলাকা জুড়ে পণ্যবাহী ট্রাক নদী পাড়ের অপেক্ষায় ছিল। দৌলতদিয়ায় ৪ ও ৬নং ঘাটের রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন ফেরিতে উঠানামা করছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলা থেকে আসা ঢাকামুখী কোরবানির পশুবাহী ট্রাকগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফেরি ঘাটে আসতে সহযোগিতা করছে  কর্তৃপক্ষ।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত দুই দিনে যমুনার তীব্র স্রোতে সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের শিমলা এলাকায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি, মসজিদ, ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে আশপাশের আরো কয়েকটি  গ্রাম। এ দিকে যমুনায় পানি বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলার কাজীপুর, সদর, উল্লাপাড়া, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা  জানান, উপজেলার হাবিবুল্লাহনগর ইউনিয়নের ফরিদপাঙ্গাসী গ্রামে রুকাইয়া খাতুন (৫) ও পোতাজিয়া ইউনিয়নের কাকিলামারী গ্রামের দেড় বছরের শিশু শাহাদত্ হোসেন নামের দুই শিশু বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। শুক্রবার বিকেলে এ দুটি ঘটনা ঘটে। নিহত রুকাইয়া খাতুন ফরিদপাঙ্গাসী গ্রামের আবু বক্কারের মেয়ে ও শাহাদত্ হোসেন কাকিলামারী গ্রামের ইমরান হোসেনের ছেলে বলে জানা গেছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় হাতিবান্ধা-সারমারা পাকা রাস্তা ভেঙে নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলায় প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান এমপি গতকাল সরিষাবাড়ীর দুর্গম চরাঞ্চলে ত্রাণ বিতরণ করেছেন।

টেকেরহাট (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, কুমার নদের পানি বৃদ্ধির ফলে রাজৈর উপজেলার কবিরাজপুর, ইশিবপুর ও বদরপাশা ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষ। অন্য দিকে নদীর তীব্র ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়েছে বেশ কয়েকটি পরিবার।

সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় নতুন নতুন এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করছে। প্রবল সে াতের তোড়ে চন্দ্রপাড়া হইতে বাবুরচর সড়কের খালাসীডাঙ্গী ব্রিজ ভেঙে গেছে। চরাঞ্চলের বানভাসি পরিবারগুলো গরু-ছাগল ও পরিবারপরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কুমুদিনী হাসপাতাল কমপ্লেক্স, হাসপাতাল রোড, শেখ রাসেল স্টেডিয়ামসহ পৌরসভার অধিকাংশ এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলা সদর থেকে আট ইউনিয়নের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

সিংড়া (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। চলনবিলের গ্রামগুলোর লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি, তারা বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজেদের টিকিয়ে রাখছে। ইতিমধ্যে ২২টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলের সহস াধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, সবজিখেত তলিয়ে গেছে। উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের সাহেবেরচর গ্রামের অধিকাংশ এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।

চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তলিয়ে গেছে রাস্তা-ঘাট, রোপা আমন বীজতলাসহ ফসলের জমি। প্লাবিত হয়েছে বাড়িঘর। তলিয়ে গেছে শতাধিক পুকুর।