অণুগল্প

আহা

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২০, ২১:১৬

 

মৃত্যু নিয়ে আমার আফসোসের শেষ নেই। মরে যেতে যেতে প্রিয়ার স্পর্শ পেতে চেয়েছিলাম। মৃত্যুশয্যায় অন্য দশজনের মতো আমাকে ঘিরেও আপনজনেরা কান্না করুক তা আমার প্রত্যাশায় ছিল। কিন্তু হতাশ হয়েছি আমি। তিন তিনটা রাত ভেন্টিলেটরে ঝুলেছিল আমার আমি। চোখের দেখাও দেখতে আসেনি কেউ। এমন ঝুঁকিপূর্ণ মৃত্যু জীবনে দেখিনি। শুনিওনি কারো মুখে। আহা!

মনে পড়ে অফিস করে বাড়ি ফিরলে ছেলেটা লাফিয়ে আমার কাঁধে চড়ত। ক্লান্ত শরীর তার ছোঁয়ায় সতেজ হয়ে উঠত। পোশাক পালটে বাথরুমে ঢুকলে দরোজায় থাপড়াত সে। তাড়াহুড়া করে হাতে-মুখে পানি ছিটিয়ে বের হতেই ঘ্যান ঘ্যান করত—ঘোড়া চড়ব, ঘোড়া চড়ব বলে। আমি দুই হাতকে পা বানিয়ে প্রস্তুত হতেই আমার পিঠে চড়ত সে। তার নাম রেখেছিলাম আদর। সেই আদরও আসেনি হাসপাতালে। আহা!

নার্সদের বিরক্ত করতাম আমি—সিস্টার আমার খোঁজে কেউ এসেছিল?

প্রথম প্রথম আমতা আমতা করলেও পরে কিছু না বলেই নার্সদের মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখেছি। শ্বাসকষ্টের বুকে তখন পাথর চাপার কষ্ট হতো আমার। যখন মৃত্যু হলো তখন জলতৃষ্ণা পেয়েছিল খুব। চাতক মুখে জল দেবার কেউ ছিল না।

মৃত্যুর পর হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকল আমার লাশ বেওয়ারিশ হয়ে। দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা আড়াল করে এলো আমার একমাত্র ছেলে আদর। আঙুল তুলে বলল, ‘ঐ যে ডানপাশের লাশটা ওটা আমার বাবার। এটা নয়, ঐটা, ঐ যে কাঁচাপাকা চুল।’

লাশঘরের লোকজন এলো—আমার লাশ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ট্রলিতে তুলল। আমার স্মার্ট ছেলে হ্যান্ডগ্লাভস পরা হাতে আলতো করে আমার পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করল। ওটার বুক খুলে ভেতর থেকে তিনটা ব্যাংকের তিনটা ডেভিড কার্ড বের করে নিল। সবগুলোর পাসওয়ার্ডই তার জানা। আমি বেঁচে থাকতে ওকে দিয়েই টাকা ওঠাতাম।

ডেভিড কার্ড তিনটি আদর তার মানিব্যাগের বুকে রেখে চেন আটকাল। মুখে রাজ্যজয়ের হাসি তার। সে পা বাড়াল সামনে। পেছন থেকে লাশঘরের এক তরুণ ডেকে বলল, এই যে ভাই আপনি চইলা যাইতাছেন?

আমার ছেলে আদর পা থামিয়ে ঘুরল। আমার মানিব্যাগে থাকা খুচরো কিছু টাকা ঐ তরুণকে দিয়ে হনহনিয়ে হাঁটা ধরল।

আরে ভাই আপনার বাবার লাশ নিবেন না?

আমার ছেলেটা লাশের দিকে ভুলেও তাকাল না। বিড়বিড় করে বলল, ‘লোক এসে নিয়ে যাবে লাশ।’ আহা!

কিন্তু কেউ আসেনি। পরদিন দুপুরে আঞ্জুমান মফিদুলের গাড়ি এলো। তারা আমার লাশ হেঁচড়িয়ে গাড়িতে তুলল।

শীতের নামতা শিখিনি বলে চিরকালই শীত পোহালাম আমি। শেষতক মরেও। আহা!

আমার জন্য কারো মায়া হলো না।

যাপিত জীবনের প্রচ্ছদপটে নেমে এলো অমানিশা।

লজ্জাশূন্য ভালোবাসার দেখা পেলাম না। আহা!!

এ কেমন জীবন, মৃত্যু?