চরম দুরবস্থায় বেড়ার তাঁতিরা বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২০, ২১:২৪

রতন কুমার আচার্য, বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা

পাবনার বেড়া উপজেলার মালদাপাড়া গ্রামের ইব্রাহিম হোসেনের বাড়িতে দুটি তাঁত। করোনা পরিস্থিতির কারণে কাজ না থাকায় মাস তিনেক দুটি তাঁতই বন্ধ রেখেছিলেন। ইদুল-আজহার হাটকে সামনে রেখে সপ্তাহ তিনেক আগে চালু করেছিলেন তাঁত দুটি। তাঁতে উত্পাদিত লুঙ্গি হাটে নিয়ে এমনিতেই লাভের দেখা পাচ্ছিলেন না। এর ওপর সপ্তাহখানেক আগে তাঁতঘরসহ বাড়ির বসতঘরগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশ্রয় নেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে। গত দুই দিন ধরে পানি কমায় তাঁতঘর থেকে পানি নেমে গেলেও উঠানে এখনো পানি রয়েছে। শুক্রবার বাড়ি ফিরে তাঁতঘরের অবস্থা দেখে তার মাথায় হাত। তাঁতঘরের একাংশ ধসে পড়েছে। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বসতঘরগুলোও। সবচেয়ে বড় কথা হলো পানিতে ডুবে থাকায় দুটি তাঁতযন্ত্রই অকেজো হয়ে পড়েছে। এখন তিনি অস্থির হয়ে পড়েছেন তাঁতঘর, বসতঘর ও অকেজো তাঁত মেরামতের চিন্তায়। এর সঙ্গে খাবার যোগাড়ের চিন্তা তো আছেই। কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে ইব্রাহিম হোসেনের। তিনি বলেন, ‘করোনায় আয়-রোজগার বন্ধ হয়া গেছিল। শেষ সম্বল তাঁত দুইখান নিয়্যা বাঁচার আশা করিছিল্যাম। কিন্তু বন্যায় সেই আশাও শেষ হয়া গেল।’

 ইব্রাহিমের মতো একই দশা বেড়ার বন্যাকবলিত সব তাঁতির। ঈদ মৌসুমে যেখানে তাঁতিদের কর্মব্যস্ত থেকে বাড়তি আয় করার কথা সেখানে তারা লড়াই করছেন পানির সঙ্গে। করোনার কারণে গত ঈদুলফিতরে বন্ধ ছিল উপজেলার বেশির ভাগ তাঁত। ইদুল-আজহায় অল্প কিছু তাঁত চালু হলেও ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে বন্যা। তাঁতিদের অনেকেই  নতুন করে মহাজন ও এনজিওসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ঋণ নিয়ে রঙ-সুতা কিনে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁতঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় তাদের তাঁতযন্ত্রই শুধু নষ্ট হয়নি, ঋণের টাকায় কেনা রঙ-সুতাও নষ্ট হয়েছে। তাঁতিরা জানান, এবারের বন্যায় বেড়া উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে মালদাপাড়া, পেঁচাকোলা, উত্তর পেঁচাকোলা, রাকশা, সাফুল্যাপাড়া, বাটিয়াখরা, নেওলাইপাড়া, সোনাপদ্মা, রূপপুর, খানপুরাসহ তাঁত সমৃদ্ধ অন্তত ১৫টি গ্রাম রয়েছে। করোনার কারণে গ্রামগুলোর ১০ হাজার তাঁত শ্রমিক এমনিতেই ধুঁকছিলেন। বন্যা তাদের পথে বসিয়েছে বলে তাঁতিরা জানান।

শুক্রবার উপজেলার পেঁচাকোলা, উত্তর পেঁচাকোলা ও মালদাপাড়া গ্রাম ঘুরে তাঁতিদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করা গেছে। পানি কমতে থাকায় গ্রামগুলোতে তাঁতিরা ফিরতে শুরু করেছেন। বন্যার পানিতে তাঁতঘর ও তাঁতযন্ত্রসহ তাঁতের অন্যান্য উপকরণ নষ্ট হওয়ায় অনেক তাঁতিকেই হা-হুতাশ করতে দেখা যায়। তাঁতিরা আক্ষেপ করে জানান, তাঁতযন্ত্র ও তাঁতঘরের যে দশা হয়েছে তাতে তাঁতিরা সর্বস্বান্তই হয়ে গেলেন। উত্তর পেঁচাকোলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় বৃহত্তর পেঁচাকোলা তাঁতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ডুবে থাকা তাঁতযন্ত্রের কিছু সামগ্রী উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। তাঁতিদের নেতা হলেও অত্যন্ত দরিদ্র তিনি। বন্যায় তাঁতঘর ও বসতঘরগুলোরও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার। ইউসুফ আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার বাড়িতেই ঠিকমতো চুলা জ্বলছে না। অন্য তাঁতিদের অবস্থা আরো খারাপ। পেঁচাকোলা ও উত্তর পেঁচাকোলা গ্রামে ৫০০ তাঁতি পরিবারের বাস। এর মধ্যে অন্তত সাড়ে চারশ পরিবার বন্যায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে।’

 পেঁচাকোলা গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য সেল্টু মিয়া বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের অন্তত ১ হাজার পরিবার বন্যাদুর্গত। এর মধ্যে তাঁতি পরিবার রয়েছে ৫০০। করোনার পর বন্যার আঘাতে তাঁতিরা নিঃস্ব হওয়ার পথে।’ বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আনাম সিদ্দিকী বলেন, ‘বন্যাকবলিত অসহায় তাঁতিদের বিষয়টি আমি অবশ্যই দেখব। আসলে বন্যাকবলিতদের জন্য আলাদা কোনো ত্রাণ সহায়তা না এলেও ঈদ উপলক্ষ্যে উপজেলায় বড় ধরনের ত্রাণ সহায়তা (ভিজিএফ) এসেছে। বন্যাকবলিত এলাকাতেই এগুলো অগ্রাধিকারভিত্তিতে দেওয়া হবে। এর মধ্যে অসহায় তাঁতিদের ব্যাপারে আরো অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’