ওয়েস্কেলের কার্যক্রমে শুভংকরের ফাঁকি

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২০, ২১:৩৮

সড়কে যত অধিকসংখ্যক ওভারলোড গাড়ি চলে, তত বেশি আয়—ওয়েস্কেলের কার্যক্রমে ইহাই এখন অঘোষিত নীতি! কারণ, পণ্য বহনকারী গাড়িচালক ও পণ্যমালিকরা ‘যত খুশি ওভারলোড করুক, জরিমানা একই’। সুতরাং তাহারা এই সুযোগ কাজে লাগাইতেছে। দেশে এক্সেল লোড-সংক্রান্ত নীতিমালা কার্যকর থাকিলেও ইহাতে রহিয়া গিয়াছে বড় ধরনের শুভংকরের ফাঁকি। এই যাবত্ যত বেইলি ব্রিজ ভাঙিয়া পড়িয়াছে, তাহার সিংহভাগই ঘটিয়াছে অতিরিক্ত ওজনের কারণে।

সওজ সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে প্রথম এক্সেল লোড নীতিমালা প্রণয়ন করিবার পর ঐ বত্সরে ১ জুলাই হইতে ইহা কার্যকর করিবার কথা ছিল। তবে ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকদের বাধায় দফায় দফায় তাহা স্থগিত হইয়া যায়। বাড়তি ওজনের গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনিতে প্রায় পৌনে দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের মহাসড়কগুলিতে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রক সেল বসানো হইয়াছে; কিন্তু এক্সেল লোড নীতিমালা কার্যকর হইলেও ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কমে নাই। বিশ্বে বর্তমানে সবচাইতে উন্নতমানের সড়ককাঠামো রহিয়াছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। অথচ এই সকল দেশে দুই এক্সেলের ট্রাকে গড়ে ১৮-১৯ টন পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়। তিন এক্সেলের ট্রাকে ইহার পরিমাণ ২৪-২৬ টন। আর চার এক্সেলের মোটরযানে পণ্য পরিবহনের অনুমতি রহিয়াছে গড়ে ৩৬-৩৮ টন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এই সীমা আরো কম। অথচ বাংলাদেশে এই সীমার চাইতেও অধিক পরিমাণ পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হইয়াছে। আবার ওয়েস্কেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত না মানিয়া সমহারে জরিমানা আদায় করিতেছে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। ইহাতে প্রতিদিন জরিমানা আদায়ের মোট টাকার পরিমাণ বাড়িতেছে। এই আয় হইতে প্রতিষ্ঠানটি শতকরা হারে টাকা পাইয়া থাকে।

স্বাভাবিকভাবেই অনুধাবন করা যায়, ওয়েস্কেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটির অঘোষিত লক্ষ্য থাকে—যত বেশি গাড়ি অতিরিক্ত পণ্য বহন করিবে ততই তাহাদের লাভ। অপরদিকে পণ্য বহনকারী যানের মালিক/চালকরা ২ হাজার টাকা করিয়া জরিমানা দিয়া নির্ধারিত সীমার চাইতে অনেক বেশি ওজনের মালপত্র বহন করিতেছে। অর্থাত্ পণ্য বহনকারী গাড়িচালক ও পণ্যমালিকরা যত খুশি ওভারলোড করুক, জরিমানা একই। ইহাও বড় ধরনের ফাঁকি। ইহা বেশি ওভারলোডে অধিক পণ্য পরিবহন করিতে পরিবহন ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করিতেছে বলা যায়। সড়ক প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত ওজনের দ্বিগুণ ওজন বহন করিলেই মহাসড়কের ১৬ গুণ ক্ষতি হয়। ফলে, সর্বোচ্চ ব্যয়ে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণের পরও আয়ুষ্কালের অর্ধেক সময়ও টিকিতেছে না মালবাহী গাড়ির মাত্রাতিরিক্ত মালামাল পরিবহনের কারণে। অথচ স্কেল ব্যবহার করিবার মাধ্যমে লোডিং নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তিনটি লাভ হইবে। প্রথমটি হইল, সড়কের ক্ষতি কম হইবে। দ্বিতীয়ত, গাড়ির ক্ষতি কমিয়া আসিবে। তৃতীয়ত, সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস পাইবে। সুতরাং শুধু জরিমানাই নহে, পণ্য পরিবহনকারীরা যাহাতে ওভারলোড করিয়া পণ্য বহন না করেন, এক্সেল লোড নীতিমালায় সেই ব্যবস্থা না থাকিলে আখেরে এই সমস্যা দূর হইবে না।