ড. আবদুল লতিফ মাসুম
যে কোনো রাষ্ট্র ও সমাজে এমন কিছু দার্শনিক, মনীষী ও বিজ্ঞজন থাকেন যাদের প্রতি সমগ্র জাতির শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান প্রশ্নাতীত; কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের যে অসহিষ্ণুতা, অসমঝোতা যেভাবে অনালাপনীয় সাংঘর্ষিক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে তা অকল্পনীয়। ব্যক্তিগত, দলীয় বা গোষ্ঠীগত বিভাজন এতই তীব্র যে, জাতীয় নেতা বা জাতীয়ভাবে সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া বিরল। এ অবস্থার দুটো দিক—ব্যক্তি তার আনুগত্য ও কর্মধারার মধ্যে নিজেই চারপাশে তৈরি করেন বিভেদের দেওয়াল। অপরদিকে সরকার ও সমাজ তার নীতি ও কার্যক্রমের মাধ্যমে তৈরি করেন এমন বিভাজন যা ব্যক্তি অতিক্রম করতে চাইলেও তা হয়ে ওঠে নাগরিকের জন্য কঠিনতর। রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ একটি উদ্দিষ্ট লক্ষ্য। বহুমত ও পথের মধ্যে মধ্যপন্থা নির্ধারণ বা সমঝোতার নীতিগ্রহণ সমাজের জন্য অধিকতর শ্রেয়। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভেদের মধ্যে ঐক্য সাধনের ব্যক্তি একান্তই দুর্লভ। সেক্ষেত্রে সদ্য প্রয়াত প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ একজন ব্যতিক্রম। নিজস্ব আদর্শিক ভিত্তি সত্ত্বেও সব মত ও পথের প্রতি তিনি সম শ্রদ্ধাশীল। তিনি ভলতেয়ারের সেই কথাটি মনে রেখেছেন: ‘লক্ষ মানুষের মাঝে একজন যদি ভিন্ন কথা বলে তাঁর কথার স্বাধীনতার জন্য জীবনপাতেও প্রস্তুত থাকা উচিত’। তিনি তার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত গণতান্ত্রিক। উদারতা সহজ পরমসহিষ্ণুতা এবং সমঝোতার এমন মূর্তমান পুরুষ এই দেশে এই কালে খুঁজে পাওয়া বড়ই ভার। তিনি স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। নিজ গুণে ভাস্বর। একটি রাজনৈতিক শোভন অনুগামিতা সত্ত্বেও সব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিত্ব তাকে সমীহ করেন, সম্মান করেন। তিনি চরম পন্থার বিরোধী, মধ্যপন্থার দিশারি এবং প্রগতির প্রবক্তা। এভাবে তাকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে মর্যাদার সুরম্য সৌধ। ভাবাদর্শের সংঘাতে জর্জরিত জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। জাতীয় ঐকমত্যের প্রতীক পুরুষ। বাংলাদেশের জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি এবং অর্জন প্রক্রিয়ায় যে সব বুদ্ধিজীবী অর্থবহ ভূমিকা রেখেছেন প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। এই জাতির আত্মজাগৃতির ইতিহাসে যে বিষয়সমূহ বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে আমাদের আন্দোলিত করেছে সেসবের প্রতিটি ইস্যুতে রয়েছে প্রফেসর এমাজউদ্দীনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা।
এমাজউদ্দীনকে বুঝতে তার অতীতকে জানা দরকার। ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলনের দিনগুলোতে এবং ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ এইচ হলের নির্বাচিত ভিপি হিসেবে তিনি নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সচেতন শিক্ষক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে যথার্থ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একজন শীর্ষ জাতীয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই জাতি যখনই কোনো সমস্যা-সংকটে নিপতিত হয়েছে প্রফেসর এমাজউদ্দীন যথার্থ দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের জাতীয় সংগঠন ‘শত নাগরিক’ তারই সৃষ্টি। প্রফেসর এমাজ সমাজে, রাজনীতিতে এবং রাষ্ট্রের বিরাজিত দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধে বরাবরই নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। ২০০৬ সালের প্রথমদিকে তত্কালীন সরকারের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিবিধানে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এটা করতে গিয়ে তিনি কর্তৃত্বের পক্ষ থেকে বিরূপ আচরণ পেয়েছেন। তার পরামর্শের যদি যথার্থ মূল্যায়ন হতো, তা হলে গোটা জাতির এ দুর্দশা হতো না। ২০০৭ সালের প্রথমদিকে সেনাবাহিনী প্রকারান্তরালে সরকার পরিচালনা করলে প্রফেসর এমাজউদ্দীন সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক অভিলাষ সম্পর্কে সতর্ক করেন। সংস্কার প্রস্তাবনা বিষয়ে তিনি গঠনমূলক পরামর্শ দেন। যত শিগিগর সম্ভব জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে তাগিদ দেন। প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে প্রকাশিত এবং প্রচারিত তার অসংখ্য লেখা ও সাক্ষাত্কার ঐ সাক্ষ্য বহন করে। ২০০৯ সালে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে প্রফেসর এমাজউদ্দীন জাতীয় স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং সামাজিক অন্যায়-অনাচার রোধে কার্যকর জনমত গঠনে সচেষ্ট হন। ২০০৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
প্রফেসর এমাজউদ্দীন একজন মহান শিক্ষক। ১৯৫৪-৫৫ সাল থেকে ২০২০ সাল তার মৃত্যু অবধি তিনি প্রায় ৬৫ বছর শিক্ষকতায় এবং শিক্ষা প্রশাসনে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’। যে সব শিক্ষক কেবল পাঠদানের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। তিনি নিজ জীবনে সততা, স্বচ্ছতা, মহত্ব, উদারতা, নিয়মশৃঙ্খলা, মিতাচারিতা, সময়ানুবর্তিতা এবং কঠোর পরিশ্রমকে ধারণ করতেন। তার কাছের মানুষ, ছাত্র গবেষক—সবাইকে অনুরূপ গুণাবলি অর্জনে সহায়তা করেন। এভাবে ব্যক্তি থেকে সমষ্টি এবং সমষ্টি থেকে সমগ্র জাতি যাতে নৈতিক জীবন গড়ে তোলে সে জন্য তিনি ছিলেন সচেষ্ট। শিক্ষকতা, গবেষণা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, সামাজিক সংশ্লিষ্টতা— সবকিছু দ্বারা তিনি নৈতিকতা নিশ্চিত করতে চান। তার নিজের ভাষায় : ‘মানসিক প্রবৃত্তিগুলোকে সুনিয়ন্ত্রিত করার জন্য অপরিহার্য হলো নৈতিকতার মান উন্নতকরণ। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ব্যবহারিক জীবনকে সহজ, অত্মনির্ভরশীল, সক্ষম, সমৃদ্ধকরণ এবং সঙ্গে সঙ্গে তার মানসিক প্রবৃত্তি ও প্রবণতাগুলোকে সততা, পবিত্রতা এবং সুচিতাবোধে পূর্ণ করা।’ প্রফেসর এমাজউদ্দীন এ উক্তির বাস্তব ইতিবাচক উদাহরণ। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় তিনি জ্ঞান ও গবেষণায় অতিবাহিত করেছেন। আমোদ-প্রমোদ, আরাম-আয়েশ, বিলাস-ব্যাসন, অবসর-বিরোধ জীবনের প্রান্তেই ভারাক্রান্ত করেনি। জ্ঞানের দীপ্তি জ্বালিয়েছেন সব সময়। তাই তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। দেশে-বিদেশে অনেক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। সম্মানিত হয়েছেন সর্বত্র।
জাতীয় বিতর্ক সংকটে তিনি কোনো দলীয় বা কঠোর বা প্রান্তিক অবস্থান নেননি। সবাইকে নিয়েই চলতে চেয়েছেন। তার সহকর্মীরা এমনকি বিরোধী পক্ষের বিজ্ঞজনেরা এসব সাক্ষ্য দিচ্ছেন তার মৃত্যুর পরেও। সবক্ষেত্রেই দেখা গেছে জাতীয় স্বার্থ এবং জাতীয় ঐকমত্য অর্জনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কখনো কখনো বিড়ম্বিত হয়েছেন তাদের কাছে যারা তার আদর্শিক ঐক্যের ধারক বলে দাবি করে। সাম্প্রতিক কালের একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্ক নিয়ে হাইকোর্টের রায় বের হলে তিনি একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে সত্যের প্রতি তার সতত দৃঢ়তা প্রতিফলিত হয়। এ বিষয়ে একটি ভারসাম্যমূলক বিবৃতি জাতীয় ঐকমত্যের প্রতীক পুরুষ হিসেবে তার মধ্যপন্থি অবস্থানের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘পলিটিক্যাল ঐক্যের ভিতরে যে বিরোধের ফাঁক রহিয়াছে তাহা তাহাকে পরের বিরুদ্ধে টানিয়া রাখিতে পারে। কিন্তু তাহাকে নিজের মধ্যে সামঞ্জস্য দিতে পারেন না।’ সত্যি সত্যিই রাজনীতিবিদরা নিজেদের মধ্যে সামঞ্জস্য দিতে পারেন না; কিন্তু রাজনীতি নিরাসক্ত এক দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী সম্ভবত পারেন। প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন পেরেছেন। তার কারণ তিনি অসম্ভব রকম সংযমী। সংযমী তার ভাষায়, সংযমী তার লেখায়, সংযমী তার কার্যক্রমে। এমনকি আলাপে আড্ডায় অলস অবসরে।
প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আমার শিক্ষক। ১৯৭৭ সালের কোনো অলস বিকালে ক্লাস নিতে এলেন। কানাডা থেকে সবেমাত্র পিএইচডি করে ফিরেছেন। সেই প্রথম ক্লাস। শুনেতো সবাই মুগ্ধ হলাম। ‘তিনি এলেন, তিনি দেখলেন, তিনি জয় করলেন—ভিনিভিসি ভিডি’। অলস বিকালটা ঝরঝরিয়ে উঠল। তিনি বাক্ভঙ্গিমায় চমত্কার। পরে দেখলাম লেখেন চমত্কার। স্নেহ মমত্বে বাত্সল্যে চমত্কার। প্রশাসক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতা চমত্কার। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুসমূহে দিকনির্দেশনায় চমত্কার। এই বহুধা চমত্কারিত্ব একক ব্যক্তিত্বে বিরল। শুধু এমাজউদ্দীনের পক্ষেই এটা সম্ভব। তার উদাহরণ তিনিই। তাই তিনি অনুকরণীয়, অনুসরণীয়। A role model for someone’s life. আমার জীবনের অভীষ্ট আদর্শ।
একটা প্রজ্বলিত প্রদীপ থেকে আলো নিচ্ছে অসংখ্য প্রদীপ। প্রদীপ তার দীপ্তি হারায় না। জ্ঞানদীপ্ত তিনি। ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’। সকলেই শিক্ষক নয়। কেউ কেউ শিক্ষক। তিনি প্রকৃতই একজন শিক্ষক। একজন মহান শিক্ষক। তাকে ঘিরে আমার অনেক স্মৃতি। সেক্সপিয়ারের ভাষায়—‘Some are born great, Some achieve greatness and Some have greatness thrust upon them’ বিজ্ঞজনদের উপলব্ধি, ‘Professor Emajuddin achieved greatness by dint of his virtue.’ তিনি তার জ্ঞান ও পুণ্যময় জীবন দিয়ে যথার্থই মহত্ব অর্জন করেছেন। তার আলোকিত মানস চিরকাল আমাদের আলোকিত করুক, আলোড়িত করুক। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন জাতিকে আলোকিত করার জন্য তার আদর্শ চিরকাল আমাদের পাথেয় হোক।
n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
