জাল নোটের কারবার দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করিয়া দিতে পারে। ইহার কারণে সাধারণ মানুষ বিড়ম্বনায় পড়িতেছেন। তাহারা প্রতারণার শিকার হইতেছেন। প্রতি বত্সর দুই ঈদ ও পূজা-পার্বণকে কেন্দ্র করিয়া জাল নোটের কারবারিরা সক্রিয় হইয়া উঠে। এই বত্সর ঈদুল ফিতরে করোনা মহামারির কারণে ঈদের বাজারগুলি জমিয়া উঠে নাই বলিয়া তাহারা তেমন সুবিধা করিতে পারে নাই। কিন্তু ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করিয়া তাহারা অপতত্পরতা শুরু করিয়াছে। বিশেষ করিয়া কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করিয়া সারা দেশে জাল নোটের সিন্ডিকেট সক্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। গত ১৮ জুলাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীর বংশালে অভিযান চালাইয়া একটি ফ্ল্যাট হইতে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা উদ্ধার করে। জাল নোটের পাশাপাশি উদ্ধার করে কাগজ, প্রিন্টারে ব্যবহূত বিভিন্ন ধরনের কালি, নিরাপত্তা সিলসংবলিত স্ক্রিন বোর্ড, গাম, ফয়েল পেপার, কম্পিউটারসহ বিশেষ কিছু যন্ত্রপাতি। ঐ ফ্ল্যাটটি গড়িয়া তোলা হইয়াছিল একটি জাল মুদ্রা তৈরির কারখানা হিসাবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলিতেছে, রাজধানীতে অন্তত ২৫-৩০টি বাসায় কারখানা বানাইয়া জাল মুদ্রা তৈরি করিতেছে বিভিন্ন প্রতারক চক্র। এই সকল চক্র নিয়ন্ত্রণ করিতেছে ২০টি দল বা গ্রুপ। তাহাদের সহিত জড়িত রহিয়াছে জাল টাকার ডিলার ও বাজারজাতকারী সদস্য। গত দেড় মাসে অন্তত ৫ কোটি জাল টাকাসহ বেশ কয়েক জন সদস্যকে আটক করা হইয়াছে। জালিয়াত চক্রের দক্ষ কারিগরদের তৈরি ‘নিখুঁত’ জাল টাকাতেও রহিয়াছে নিরাপত্তা সুতা। মেশিন ছাড়া জাল শনাক্ত করাই কঠিন। এখন তাহাদের অনেকে ঢাকার বাহিরে থাকিয়া জাল মুদ্রা তৈরি ও সরবরাহ করে। ১ লক্ষ টাকার বান্ডিল বিক্রয় করে ১২ হাজার হইতে ২০ হাজার টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুলিশ সদর দপ্তর হইতে জানা যায়, গত ২১ বত্সরে সারা দেশে জাল নোটসংক্রান্ত মামলা হইয়াছে ৮ হাজার ৩৬৬টি। ইহার মধ্যে চলতি বত্সরের জুন পর্যন্ত শতাধিক মামলা হইয়াছে। মামলার পর অনেক জালিয়াত চক্রের সদস্য গ্রেফতার হয় বটে, তবে আইনি দুর্বলতার কারণে তাহারা জামিনে ছাড়া পাইয়া আবার সেই কাজে জড়াইয়া পড়ে।
একশ্রেণির ব্যাংক কর্মচারীর যোগসাজশে এই সকল জাল টাকা বিভিন্ন বুথেও পাওয়া যায় অনেক সময়। কী ভয়ানক ও সর্বনাশা কথা! জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণে কঠিন শাস্তির বিধান রাখিয়া আইন পরিবর্তনের কথা চিন্তা করিলেও বত্সরের পর বত্সর তাহা ঝুলিয়া আছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী পরপর তিনবার ও ৫০০ পিসের অধিক জাল নোট নিয়া ধরা পড়িলে কেবল কেহ সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আসিবে। এই কারণে জাল নোট চক্রের হোতারা কৌশল করিয়া নূতন নূতন লোক রিক্রুট করে। এই জন্য নূতন আইন প্রণয়ন, তাহার বাস্তবায়ন, কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতাই পারে জাল নোট প্রতিরোধ করিতে।
