জয়নাল আবেদীন
আর্তমানবতার সেবায় দেশকালের ভেদ নেই। যুগে যুগে এ আদর্শ নিয়ে যারা কাজ করেন তারা কীর্তিমান। তাদের পরশে অবহেলিত জনগোষ্ঠী নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হন। নতুন করে বাঁচতে শেখেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধুপুর বনাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গারোরা একসময়ে ছিলেন এমনই পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠী। শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চায় তাদেরকে মূলধারার জনগোষ্ঠীর সমানতালে যিনি নিয়ে আসেন তার নাম ফাদার ইউজিন হোমরিক সিএসসি। মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় গারোদের ত্রাতার ভূমিকায় টানা ছয় দশক কাজ করেছেন তিনি। এ মহত্প্রাণ মানুষটি গত শুক্রবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে আমেরিকায় ইন্তেকাল করেন। ইউজিন হোমরিক ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকার মিসিগান অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। ওয়াশিংটন ডিসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধর্মতত্ত্বে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার পর তিনি পাদরির মতো সংযমী জীবনকে বেছে নেন। ১৯৫৫ সালে হলিক্রস মিশনারি হিসেবে এদেশে আসেন। তিনি ১৯৫৯ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের জলছত্র ক্যাথলিক মিশনের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মধুপুরের পীরগাছা মিশনে কর্মরত ছিলেন। তিনি মধুপুর বনাঞ্চলের গারোদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা অনুভব করে প্রত্যন্ত এলাকায় মিশনারি স্কুল খুলে শিশুদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করেন। চালু করেন মিশন হাসপাতাল। বিনা মূল্যে ওষুধ ও চিকিত্সাসেবার ব্যবস্থা করেন। গারোদের মূল পেশা ছিল জুমচাষ। পঞ্চাশের দশকে জুমচাষ নিষিদ্ধ হলে জীবনজীবিকা হুমকির মুখে পড়ে। তিনি ত্রাতার ভূমিকায় পাশে দাঁড়ান। ফাদার হোমরিকের ভাষায়, ‘আমি এখানে এসে স্কুল খুলেছি। বহু চেষ্টায় তাদের স্কুলমুখী করেছি। বুঝিয়েছি শিক্ষা ছাড়া গতি নাই।’ মধুপুর গড়ে গারো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। তিনি প্রাইমারি লেভেলে গারো ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। এখন বনজঙ্গল, পাহাড়ি টিলা পাড়ি দিয়ে গারো শিশুরা দল বেঁধে স্কুলে যায়। জাতীয় দিবস ছাড়াও আদিবাসি সংস্কৃতির ওয়ানগালা, রংচুগালাসহ বড়দিনের মতো ধর্মীয় ও সামাজিক উত্সব পালন করে। তিনি জলছত্র এবং পীরগাছায় দুটি মিশন উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। হোস্টেলে থেকে গারো মেয়েরা পড়াশোনা করে। দরিদ্র শিশুদের পড়ালেখায় বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। তার প্রচেষ্টায় গারোদের শিক্ষার হার ৮৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। তিনি কারিগরি শিক্ষা ও বিনা সুদে ক্রেডিট প্রোগ্রাম চালু করেন। গড়ে তোলেন সঞ্চয়ী অভ্যাস। তারই উত্সাহে অনেক গারো যুবক আজ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে ওঠেন। একাত্তরে ফাদার হোমরিকের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন করলেও মার্কিন নাগরিক ফাদার হোমরিক মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দেন। তিনি আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জলছত্র হাসপাতালে গোপনে চিকিত্সার ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জলছত্র মিশন হাসপাতাল ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আশা-ভরসাস্থল। একাত্তরের ৫ এপ্রিল মেজর সফিউল্লাহ্র নেতৃত্বে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা জলছত্র মিশনে ঘাঁটি গাড়েন। ১২ এপ্রিল ঢাকাস্থ ইউএস কাউন্সিল ফাদার হোমরিককে মধুপুর ত্যাগের পরামর্শ দেন। কিন্তু সে অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ২০১৪ সালে দৈনিক ইত্তেফাককে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে জানান, মেজর সফিউল্লাহ্ জলছত্র অবস্থানকালে ১৪ এপ্রিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ক্যাপ্টেন বালজিত্ সিং এবং ক্যাপ্টেন নেগি গোপনে সাক্ষাত্ করেন। হানাদার বাহিনী ২৪ এপ্রিল জলছত্র মিশনে হামলা চালায়। ফাদার হোমরিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একাত্তরের ১৫ জুলাই আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিনিধি মি. পিটার থান এবং ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিনিধি মি. লি লেক্সজ মধুপুর মিশনে আসেন। ফাদার হোমরিক তাদেরকে নিয়ে মধুপুর বনাঞ্চলের ভেদুরিয়া গ্রামে যান। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রেফাজউদ্দীনের সাক্ষাত্কার নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার সেই প্রতিবেদন দুটি পত্রিকায় ছাপা হলে মার্কিন মুলু্লকে হইচই পড়ে যায়। মি. পিটার থান পরবর্তী সময় এ প্রতিবেদনের জন্য পুলিত্জার পুরস্কার পান। একাত্তরের ২২ জুলাই পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ৪৩ জন গারো নেতাসহ ফাদার হোমরিককে গ্রেফতার করেন। তার নিজের ভাষায় : ‘ব্রিগেডিয়ার আসাদুল্লাহ বললেন, তোমাদেরকে গুলি করা হবে। বললাম—আপত্তি নাই। কিন্তু জানতে চাই আপনি কোথায় ট্রেনিং নিয়েছেন? উত্তরে বললেন—ইউএস আর্মি, নিউজার্সিতে। বললাম, ঠিক আছে আগামীকাল খবর হবে আমেরিকায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার একজন আমেরিকান যাজককে হত্যা করেছেন। তারপর কী ভেবে আমাদেরকে ছেড়ে দিলেন।’ একাত্তরের গণহত্যা প্রসঙ্গে তিনি জানান, আগস্টে মুক্তাগাছা থেকে হাফিজা নামের এক শিশুকে মুমূর্ষু অবস্থায় জলছত্র হাসপাতালে আনা হয়। বাবা-মা দুই জনই হানাদারদের গুলিতে প্রাণ হারান। চিকিত্সা দিয়ে শিশুটিকে সুস্থ করেন। স্বাধীনতার পর কেউ তাকে নিতে না আসায় কানাডার এক দম্পতিকে দত্তক দেওয়া হয়। তার বর্তমান নাম সীতা এডওয়ার্ড। তিনি বেশ কয়জন যুদ্ধশিশুকে আমেরিকায় দত্তক নিতে সহযোগিতা করেন। একাত্তরে অনন্য অবদানের জন্য ২০১২ সালে শেখ হাসিনা সরকার তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করেন। জন্মগতভাবে ছিলেন মার্কিন নাগরিক। কিন্তু মননে, চলনে, বলনে এবং ভালোবাসার ক্ষরণে ছিলেন সব মানুষের আপনজন। তার চিরবিদায়ের খবরে গারো, কোচ ও বাঙালির মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
n লেখক :কলেজশিক্ষক ও সংবাদকর্মী
