ঈদ আয়োজন হোক বন্যার্তদের সঙ্গে

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২০, ২১:২৫

ফারহানা নওশিন তিতলী

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছি। এই মহামারির মধ্যে বেঁচে থাকা প্রতিটি মানুষের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মহামারির মধ্যে আমরা আরেকটি বৃহত্ প্রাকৃতিক যে সংকটের মধ্যে পড়েছি—সেটা হলো বন্যা। প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে নিম্নাঞ্চলে বন্যার প্রকোপ দেখা যায়। প্রতি বছর বন্যার পানি বাড়তে থাকে আর সারা বছরের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে লাখ লাখ মানুষের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নের মৃত্যু হয়। যে মৃত্যুকে চোখের সামনে হতে দেখেও নিরুপায় হয়ে চোখের জল ফেলা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফসল ও গবাদি পশু নিয়ে মানুষ তীব্র বিপদে আছে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ। পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতিসহ এসব জেলায় বানের পানি বাড়লে মানুষ আরো মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হবে। এ ছাড়া বন্যার সময় পানিবাহিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব তো আছেই। এমনকি ফসলহানির কারণে চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ে।

আর কয়েক দিন পরেই মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উত্সব ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহার বিশেষত্ব হলো—পশু কোরবানি। সামর্থ্যবান বা নির্ধারিত সম্পত্তির মালিকদের জন্য ইসলাম ধর্মে পশু কোরবানি ওয়াজিব। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দেশের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত—সবারই অর্থনৈতিকভাবে বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। উচ্চবিত্তদের জীবনব্যবস্থার মান হয়তো একটু কমে গেছে; কিন্তু বিপাকে পড়েছেন দেশের নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তরা। বিগত বছরে যারা কোরবানি করতেন এবছর তাদের মধ্যে অনেকেই কোরবানি দিতে পারছেন না। অর্থনৈতিক সংকট ও করোনা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য এবছর ঢাকায় পশুর হাটে মানুষের সমাগম তুলনামূলক কম। করোনার ধাক্কা সামলাতেই যখন হিমশিম জনগণ, তার ওপর আবার নিম্নাঞ্চলের মানুষের জন্য আরেক অভিশাপ হিসেবে বন্যার আগমন হয়েছে। সারা বছরের জমানো সম্পত্তি তো তলিয়ে গেছেই সঙ্গে জীবনের ঝুঁকিও তাদেরকে দিশেহারা করে দিচ্ছে। ঈদের অনন্দের কথা তো দূরে থাক সামনের দিনে জীবন ও জীবিকা নির্বাহের চিন্তাতেই দিশেহারা বানভাসি মানুষ।

আসন্ন কোরবানির পশুর মাংস দিয়ে বানভাসি মানুষকে সাহায্য করা সম্ভব না হলেও কোরবানির সমপরিমাণ টাকা আমরা এসময়ে অসহায় মানুষের মধ্যে দান করতে পারি। অন্য সময়ে যারা বেশি পরিমাণে কোরবানি করতেন, বেশি টাকা দিয়ে পশু কিনতেন—এবার তা না করে অতিরিক্ত অর্থ বিলিয়ে দিতে পারেন। কোরবানির সময় এটাও খেয়াল রাখতে হবে—কোরবানির পশুর গোশত ও চামড়ায় গরিবের হক রয়েছে। চামড়ার ন্যায্যমূল্য থেকে গরিবরা যেন বঞ্চিত হয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোরবানির মাংস দিয়ে ফ্রিজ ভর্তি করে দেশের অগণিত দরিদ্র মানুষকে দেখিয়ে দেখিয়ে ভূরিভোজন করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোরআনে বর্ণিত আছে, কোরবানির পশুর রক্ত-মাংস তার কাছে পৌঁছায় না, তিনি দেখতে চান মানুষের মন। হাদিসে বর্ণিত আছে, মানুষের মনুষ্যত্বের উদারতা পরীক্ষা করার জন্যই এই কোরবানি প্রথা চালু করা। দেখানো উদারতার জন্য নয়। তাই অন্তত এই সময় লোক দেখানো কোরবানি থেকে বিরত থাকা উচিত।

নিজেদের বাড়িঘর সব হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করা মানুষের অবস্থা কতটা শোচনীয় তা একটু গভীরভাবে ভাবলেই বোঝা যায়। বন্যার পানিতে সহায়সম্বল বিলীন হাওয়াতে মানসিকভাবে তারা কতোটা অসহায়। এই পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারী, বয়োবৃদ্ধ ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এছাড়া নারীদের নিরাপত্তার দিক তো রয়েছেই। বন্যা মূলত প্রাকৃতিকভাবে হলেও সম্প্রসারিত গবেষণায় বন্যার মূল হোতা মূলত আমরাই।

তাই আমরা যদি প্রত্যেকের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে একটু সততার পরিচয় দেই তাহলে বেঁচে যায় দেশ, বেঁচে যায় বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ। পরিশেষে নজরুলের কাব্যের মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষের দুর্দিনে সবাই মিলে অঙ্গীকার করি, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে।’

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া