কথায় আছে, আশায় বাঁচে চাষা। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সাড়ে সাত শত কোটি মানুষই চাষা হইয়া গিয়াছে। কোভিডের একটি কার্যকর টিকার প্রতীক্ষায় তাহারা এক গভীর আশায় ভর করিতেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের ভ্যাকসিন ট্র্যাকার জানাইতেছে, গবেষকেরা বিশ্ব জুড়িয়া করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ১৫৫টির অধিক ভ্যাকসিন তৈরি করিয়াছে। তাহার মধ্যে ২২টি ভ্যাকসিন মানুষের দেহে পরীক্ষা করা হইতেছে। ইতিমধ্যে ১৩৫টি ভ্যাকসিন প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপে, ১৪টি ক্লিনিক্যাল প্রথম ধাপে, ১১টি ক্লিনিক্যাল দ্বিতীয় ধাপে, চারটি ক্লিনিক্যাল তৃতীয় ধাপে ও একটি ভ্যাকসিন মানুষের দেহে সীমিত ব্যবহারের অনুমোদন পাইয়াছে। দেখিয়া-শুনিয়া মনে হইতেই পারে—আহা, করোনার কালবেলা এইবার শেষ হইবে!
কিন্তু সত্যিই কি ভ্যাকসিন আমাদের দোরগোড়ায়? প্রথম কথা হইল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত সপ্তাহেই বলিয়া দিয়াছে, বিভিন্ন সংস্থা ভ্যাকসিন তৈরির তৃতীয় ধাপে পৌঁছাইয়া গেলেও ২০২১ সালের পূর্বে করোনার ভ্যাকসিন পাইবার কোনো আশাই নাই। গবেষকরা বহু পূর্ব হইতেই বলিয়া আসিতেছেন, একটি কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরিতে দুই হইতে ১০ বত্সর সময় লাগিয়া থাকে। যদিও করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে গবেষকেরা ১২ হইতে ১৮ মাসের মধ্যেই তাহা সম্পন্ন করিবার চেষ্টা করিয়া যাইতেছেন। হয়তো আমরা ভাবিতে পারি, এই তো কয়েক দিন পূর্ব অক্সফোর্ড, রাশিয়া, আমেরিকা প্রভৃতি দেশ ঢাকঢোল পিটাইয়া জানাইয়াছে, ভ্যাকসিন সফল! ইহা কি সত্য নহে? সত্য বটে। তবে ইহার ধাপ রহিয়াছে। নূতন ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে মূলত ছয়টি ধাপ অনুসরণ করিতে হয়—অনুসন্ধানী, প্রি-ক্লিনিক্যাল, ক্লিনিক্যাল, নিয়ন্ত্রক পর্যালোচনা এবং অনুমোদন, উত্পাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ। প্রতিটি ধাপই খুব গুরুত্বপূর্ণ। আবার প্রতিটি ধাপেরই বেশ কিছু উপধাপ রহিয়াছে। এখন এক-একটি ধাপ কিংবা উপধাপ সফল হইবার পর বিশ্ব জুড়িয়া সংবাদপত্রে হইচই পড়িয়া যায়। অনেকে বলেন, হইচই তৈরি করা হয়। কারণ, ইহাতে ব্যবসায়-বাণিজ্য হইতে শুরু করিয়া মানবসমাজের সকল অংশ একটুখানি চাঙ্গা হয় বটে। ইহাকে অনেকে একধরনের স্ট্র্যাটেজি বলিয়া মনে করেন। এইদিকে এই মাসের শুরুর দিকে ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হইয়াছে, ৩৬ বত্সর পূর্বেও আমরা এই সময়ের মতো একটি নূতন এবং রহস্যময় বৈশ্বিক মহামারির মধ্যে ছিলাম। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই এক মিলিয়নের অধিক মানুষ আক্রান্ত হইয়াছিল এইচআইভিতে এবং মারা গিয়াছিল ১২ হাজার মানুষ। সেই সময় আমরা ভাইরাসটি কীভাবে কাজ করে, তাহা জানিবার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলাম; কিন্তু তাহার পরও কেহ কেহ আশাবাদী ছিলেন—দুই বত্সরের মধ্যেই এইডসের ভ্যাকসিন পাওয়া সম্ভব হইবে।
ঐ নিবন্ধ বলিতেছে, এখন কোভিড-১৯-এর সময়েও আমরা একই পরিস্থিতির মধ্যে রহিয়াছি। প্রকৃতপক্ষে করোনা ভাইরাসের সম্পূর্ণ রহস্য এখনো মানুষ উন্মোচন করিতে পারে নাই। অথচ তাহা সত্ত্বেও এইডসের মতো অনেকেই ২০২১ সালের মধ্যে কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সম্ভাবনার কথা বলিতেছে। কোভিডের রহস্য আমাদের বলিতেছে, ইহার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথ মোটেই সহজ নহে। এমনকি ভ্যাকসিন আদৌ সবাইকে সুস্থ করিতে পারিবে কি না—তাহাও অজানা। সুতরাং, সুরক্ষা মানিয়া আশা লইয়া বাঁচা ছাড়া বিশ্ববাসীর নিকট আপাতত আর কোনো উপায় নাই।
