সৈয়দ জিয়াউল হক
গত ১৫ জুলাই ২০২০ প্রয়াত হয়েছেন বিশিষ্ট ভাষাসংগ্রামী ডা. সাঈদ হায়দার। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। সেদিক থেকে বিবেচনায় তিনি দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন সন্দেহ নেই। তবু তার মৃত্যুতে ভাষা আন্দোলনের এক বিশাল মহিরুহের জীবনাবসান হলো, যা আমাদের কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৮ সাল থেকেই। জিন্নাহর মৃত্যুর পর বাংলার দুই মিরজাফর খাজা নাজিমউদ্দিন ও নূরুল আমিন আবার উর্দুকে এদেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা থেকে যে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়, পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর গুলির মাধ্যমে তার জবাব দেয়। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি গুলিতে শহিদ হন এদেশের কয়েক জন শ্রেষ্ঠ সন্তান বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউর রহমান, অহিউল্লাহ প্রমুখ।
গুলিবর্ষণের পর ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল, যা সে সময় ব্যারাক নামে পরিচিত ছিল। সেখানে স্থাপন করা হয় ভাষা আন্দোলনের কন্ট্রোল রুম। একুশের অমর স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কয়েক জন ছাত্র একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ডা. সাঈদ হায়দার। শহিদ মিনারের নকশা তৈরি করেছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের তত্কালীন ছাত্র বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দার। মিনার তৈরির সার্বিক তদারকির দায়িত্বে ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক চতুর্থ বর্ষের ছাত্র শরফুদ্দিন আহমদ।
ডা. সাঈদ হায়দারের চরিত্রের যে দিকটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে তা হচ্ছে তার আত্মপ্রচারবিমুখতা। ভাষাসংগ্রামীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি বেদনার সঙ্গে লক্ষ করেছি যে তাদের মধ্যে অনেকেই শুধু নিজের কৃতিত্ব জাহির করতে ব্যস্ত। নিজে কী করেছেন তা বলার চেয়ে কে কী করেননি এবং কার ভূমিকা কতটা গৌণ তা বর্ণনা করতে বেশি আগ্রহী। তাদের এই কলহের ফলে এমন কিছু লোকের নামের সঙ্গে ভাষাসংগ্রামীর তকমা যুক্ত হয়েছে, যাদের হয়তো ভাষা আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকাই ছিল না। ডা. সাঈদ হায়দারের আর একটি গুণ ছিল এই যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। বয়সে তিনি ছিলেন আমার পিতার সমকক্ষ। অথচ সভায়, আলাপে বা টেলিফোন করলে তিনি সব সময়ে আমাকে জিয়া ভাই বলে সম্বোধন করতেন, যা আমাকে ভীষণভাবে বিব্রত করত। অনেকবার বলেও তাকে বিরত করতে পারিনি। অথচ তাকে আমি স্যার বলতে গেলে তিনি সব সময় প্রতিবাদ করতেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল এদেশের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। তারাই ছিল পুরো আন্দোলনের পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী। তবে শহিদ মিনার তৈরির চিন্তা ও বাস্তবায়নের একক কৃতিত্ব ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের তত্কালীন ছাত্রদের, এ কথা স্বীকার করতেই হবে। শহিদ মিনার আজ সব স্বাধিকার আন্দোলনের জিরো পয়েন্ট। যতদিন সমাজে শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন ও নিপীড়ন থাকবে ততদিন শহিদ মিনার মানুষকে সংগ্রামের প্রেরণা জোগাবে। আর যতদিন শহিদ মিনার থাকবে ততদিন বেঁচে থাকবে ডা. সাঈদ হায়দারের নাম। যখনই আমি শহিদ মিনারের পাশ দিয়ে যাব তখনই আমার স্মৃতিতে ভেসে আসবে ডা. সাঈদ হায়দার, ডা. বদরুল হায়দার ও ডা. (কর্নেল) শরফুদ্দীনের মুখ। মানুষ সাঈদ হায়দার মরণশীল, কিন্তু তার কীর্তি অবিনাশী। সব মানুষের ওপর মৃত্যুর প্রভাব এক রকম নয়। কোনো কোনো মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করে চিরঞ্জীব হয়ে ওঠেন। ডা. সাঈদ হায়দার এমনই একজন মানুষ। দেশমাতৃকার এই মহান সন্তানের প্রতি লাখো সালাম।
n লেখক :প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ,
বিজ্ঞান-সংস্কৃতি সংগঠক
