মুশফিক মানুষটি একহারা গড়নের ঝিরকুটে হলেও বুকের ভেতরে একটি বিশাল হূদয় আছে—এ সত্য তার ঘনিষ্ঠদের কাছে প্রতিষ্ঠিত। অতি সাধারণ জীবনযাপন। ভালো আয়-রোজগার হলেও মাসের শেষে মানুষটির হাতে ব্যালেন্স বলতে কিছু থাকে না। অমুকের বিয়ে তো তমুকের চল্লিশা, তমুকের শ্রাদ্ধ তো শমুকের চিকিত্সা...ইত্যাদি কাজে দান করতে করতে জমানোর মতো কোনো টাকা থাকে না। অনেকেই মুশফিককে জিরো ব্যালেন্স বলে ডাকে। এতে মুশফিকের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই; বরং হেসে হেসে বলল, হস্ত মুক্ত থাকাই ভালো।
এক বিকেলে মুশফিক নিউমার্কেট যাবে ফুফুর জন্য শীতের কাপড় কিনতে। ফুফু থাকেন গ্রামের বাড়িতে। নিজের শীতের কাপড় বলতে তেমন কিছু নেই; বঙ্গবাজার থেকে একটি সোয়েটার কিনেছিল তাও তিন বছর আগে। বিকেল থেকেই একটু একটু শীত পড়ছে। মাঝে মাঝে উত্তরা হিম বাতাস শরীরে লাগলে শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। বাসা থেকে বের হয়ে মোড়ে এসে দাঁড়ায়। মোড়ে কয়েকটি রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। দুটি রিকশার চালক ভাড়া চাইল এক শ টাকা। তৃতীয় রিকশার চালক চাইল আশি টাকা। মুশফিক আশি টাকা ভাড়ায় নিউমার্কেট রওনা হয়। রামপুরা চৌধুরীপাড়া থেকে রিকশায় চড়ে মুশফিক। রিকশায় বসে সিগারেট টানে আয়েস করে। আর উদাস মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছে শীতের তীব্রতা নিয়ে।
হঠাত্ চোখ পড়ে রিকশাচালকের প্যাডেলের দিকে। রিকশাচালক এক পায়ে রিকশা চালাচ্ছে আর এক হাতে একটি কাঠের লাঠির সাহায্যে অন্য প্যাডেল নিয়ন্ত্রণ করছে। এই দৃশ্যটি মুশফিকের কাছে ছিল অভাবনীয়। মুশফিকের বুকের ভেতরটা নড়ে যায়; তছনছ হয়ে যায় কষ্টে।
মালিবাগ মোড়ে এসে মুশফিক বলল, আপনি একটু থামেন—আমি চা খাব।
রিকশাচালক রিকশা থামিয়ে মুশফিকের অপেক্ষা করে।
মুশফিক খুব আলস্যে চা খায়। এক কাপ নয় তিন কাপ। সিগারেট জ্বালায়।
এতটা সময় নষ্ট করাতে রিকশাচালক ক্ষিপ্ত, রেগে একশা—আপনি আমারে ধইর্যা রাখছেন ক্যান? চা খাইবেন আমারে বিদায় করে খান।
আরে ভাই একটু দাঁড়ান। এত অস্থির হচ্ছেন কেন?
হারা বিহালে একটা খেপ পাইলাম তাও আফনে তালিবালি করতাছেন। আমার সময়ের দাম নাই?
আরে ভাই একটু বিশ্রাম করেন। এত ব্যস্ত ক্যান। কত সময় আর নিলাম। এক কাপ চা খাইবেন?
রাহেন মিয়া আফনের চা।
রিকশাচালক রাগে গজগজ করতে করতে প্রস্থানের জন্য উদ্যত হয়। তখন মুশফিক বলল, আরে ভাই দাঁড়ান।
দাঁড়াবে কি দাঁড়াবে না ইতস্তত করে রিকশাচালক দাঁড়ায়। মুশফিক রিকশায় চড়ে। ভিড় ঠেলে রিকশাটি এগিয়ে যায়।
মুশফিক রিকশাচালকের দিকে তাকাতে পারে না। এ কি মায়া? নাকি অন্য কিছু? মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলায়।
নামেন, রিকশাচালক বলল। একরকম ভাবালুতায় ডুবে ছিল মুশফিক। রিকশাচালকের কথায় ভাবালুতা কেটে যায়, ফিরে পায় সম্বিত্।
ধীরে ধীরে নামে। ম্যানিব্যাগ বের করে পাঁচ শ টাকার একটি নোট রিকশাচালকের হাতে দেয়। রিকশাচালক অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে চোখ বড় করে বলল, আমার কাছে ভাঙতি নাই। রিকশাচালক বলতে চেয়েছিল, বড় ত্যাঁদড় মানুষ তো আপনে। মালিবাগে এতটা সময় খাইলেন আর এখন পাঁচ শ টাকার নোট দিয়ে মশকরা করেন। নিতান্ত ভদ্র বলে এই কথাগুলো বলেনি।
মুশফিক বলল, আপনার ভাঙতি দিতে হবে না। সবটাই নিয়ে যান।
মুশফিক লক্ষ করল, কিছুক্ষণ আগের রাগে কুতকুত করা ভয়ানক মলিন মুখটি থেকে আবছা অন্ধকার সরিয়ে যেন একটি পূর্ণিমার চাঁদ ফুটেছে। এই চাঁদটি পাঁচ শ টাকায় নয়, লক্ষ টাকায়ও কেনা যায় না।
