মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
মানি লন্ডারিং বা বিদেশে অর্থ পাচার যে কোনো দেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশে অর্থ পাচার এক বিরাট বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশে অর্থ পাচার নিরোধ বা বন্ধের জন্য মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ পাশ হয়েছে, যা ২০১৫ সালে প্রয়োজনের নিরিখে আংশিক সংশোধিত হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী বৈধ অনুমোদন ছাড়া দেশের বাইরে অর্থ-সম্পত্তি প্রেরণ বা পাচার কিংবা দেশের বাইরে উপার্জিত সম্পত্তি, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে তা ফেরত না আনা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিদেশে অর্জিত অর্থ বা প্রকৃত পাওনা দেশে না আনা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে নিম্নবর্ণিত কারণে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে থাকে—(ক) বিদেশে বিনিয়োগের আড়ালে অর্থ পাচার, (খ) দুর্নীতি বা অসদুপায়ে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার, (গ) মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার মতো অবৈধ ব্যবসা-অর্জিত অর্থ বিদেশে নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পাচার, (ঘ) ‘হিউম্যান ট্রাফিকিং’ বা মানব পাচারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচার, (ঙ) উন্নত সুযোগ-সুবিধার জন্য স্ত্রী-সন্তানদের বিদেশে রাখা এবং নিজেও গোপনে ঐ দেশের নাগরিক হয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য অর্থ পাচার করে জমা করা, (চ) অনেক সময় দেশে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ভবিষ্যতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির আশঙ্কায় রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী ‘নিরাপদ’ দেশে অর্থ পাচার করে থাকে এবং (ছ) মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ‘ট্রান্সফার মিস প্রাইসিং’-এর মাধ্যমেও অর্থ পাচারের সম্ভাবনা থাকে।
অর্থ পাচারের মাধ্যমগুলো হলো—ই-ট্রান্সফারের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ, হুন্ডি, কুরিয়ার সার্ভিস বা ব্যক্তি বাহকের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর। তবে বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বা থিংক ট্যাংক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)-এর মতে, বাংলাদেশের মোট অর্থ পাচারের প্রায় ৮০ শতাংশ সংঘটিত হয় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে। মুদ্রা বা অর্থ পাচারের ইচ্ছা থাকলে আমদানির ক্ষেত্রে দ্রব্যের অতিমূল্যায়ন (Over invoicing) এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের অবমূল্যায়ন (Under invoicing) করা হয়। কখনো কখনো পণ্য আমদানি-রপ্তানি না করেও অসদুপায়ে জাল কাগজপত্র তৈরি করে অর্থ পাচার করা হয়।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ২০০২ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগ চালু হয়েছে, কিন্তু অতীতে এই বিভাগের প্রতিরোধমূলক কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ চোখে পড়েনি। বিশ্বের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিটসমূহের সংগঠন এডমন্ট গ্রুপ (Edmont Group) ১৯৯৪ সালে নেদারল্যান্ডসে গঠিত হয়। বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ভিত্তিতে ২০১২ সালে গঠিত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২০১৩ সালে এডমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত ১৬৪টি সদস্য দেশের মধ্যে একটি। ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও ২০১৫ সালের সংশোধিত আইন অনুযায়ী বিএফআইইউ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশের সিআইডি পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে অর্থ পাচার প্রতিরোধে কাজ করবে। এ ব্যাপারে বিএফআইইউর সঙ্গে অন্য তিন সংস্থার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঘুষ বা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগে দুদক এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার ধরা পড়লে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তদন্ত করে মামলা দায়ের করে। এ ছাড়া হুন্ডি বা অন্য কোনো উপায়ে অর্থ পাচার হলে তা সিআইডি তদন্ত করবে। বিএফআইইউ বিদেশি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ইউনিট বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পেলে কিংবা দেশের ভেতরে সন্দেহজনক লেনদেন সম্পর্কিত তথ্য অভিযোগ বা গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারলে তা বিশ্লেষণপূর্বক তদন্ত সংস্থাসমূহের কাছে পঠায়। তদন্তকালে সংস্থাগুলো ২০১২ সালের আইন ছাড়াও সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী অপরাধীকে দোষী সাবস্ত করতে পারে।
আইনি ব্যবস্থা থাকলেও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বা সাফল্য দেখাতে পারেনি। তদন্ত করে চার্জশিট প্রদান এবং কোর্টে মামলা করার পর দীর্ঘসূত্রতা এর উল্লেখযোগ্য কারণ। কোনো মামলা সাত-আট বছরের আগে নিষ্পত্তি হয় না। এমনকি ৮-১০ বছরের পুরোনো বহু মামলা পেইন্ডিং রয়েছে। অনেক সময় চিহ্নিত সন্দেহভাজন অপরাধীর রিরুদ্ধে মামলা ও শাস্তি না হওয়াও অর্থ পাচার প্রতিরোধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের গন্তব্যস্থল কোথায় তার তথ্য সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে, প্রাথমিকভাবে সেসব দেশে এবং পরবর্তী সময়ে অন্যত্র সুবিধামতো অর্থ স্থানান্তরিত হয়। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালেই বাংলাদেশ থেকে বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, সে জন্য মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন স্থল, বিমান ও নৌবন্দরে স্থাপিত কাস্টম কমিশনারেটগুলো সুনির্দিষ্ট অর্থ পাচার কেইস সনাক্ত করে মামলা করতে পারে। তবে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এ ধরনের কাজের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান।
ইতিমধ্যে কাস্টম হাউজ, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে অনলাইনে সংযুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে, যাতে এলসি থেকে শুরু করে আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত তথ্য সব পক্ষ জানতে পারে। ব্যবসায়-বাণিজ্য অনলাইনভিত্তিক এবং সহজীকরণের জন্য এনবিআরে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো নামে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও শুল্ক রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা আসবে এবং অর্থ পাচার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। সর্বোপরি এই কাজে কাস্টমস, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দক্ষতা, আন্তরিকতা ও জবাবদিহি প্রয়োজন।
মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধে বৈশ্বিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় কর্মপন্থা (২০১৯-২১) নির্ধারণসংক্রান্ত একটি কমিটি রয়েছে। উক্ত কমিটি অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সভা করে কর্মপন্থা নির্ধারণ ও নির্দেশনা প্রদান করে। দুদকের এতত্সংক্রান্ত বিশেষায়িত কমিটি ছাড়াও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পূর্বোল্লেখিত দুটি সংস্থা এবং এনবিআরের আন্তর্জাতিক কর উইং ও কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট এতত্সংক্রান্ত কাজ করছে। মামলা তদারকি এবং বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে ‘মানি লন্ডারিং টাস্কফোর্স’ গঠন অত্যন্ত জরুরি। ২০২০-২০২১ বাজেটের অর্থবিলে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইভেয়েসিং রোধে আয়কর-সংক্রান্ত একটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এই বিধান অনুযায়ী যে পরিমাণ অর্থ আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং করে পাচার প্রমাণিত হবে, তার ওপর ৫০ শতাংশ হারে করারোপিত হবে। এটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর মাধ্যমে প্রদত্ত শাস্তির অতিরিক্ত। এনবিআর, দুদক ও পুলিশের সিআইডি—এই তিন সংস্থার মধ্যে তদন্তকারী যে সংস্থাই হোক আদালতের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ রেখে যথাশিগিগর মামলা নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।
অপরাধীকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিবেচনায় করারোপের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যকর পন্থা বলে অনেকে মনে করেন। সেজন্য বাংলাদেশি নাগরিকদের অর্থ পাচারের তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার-সংক্রান্ত চুক্তির শর্তানুসারে পাওয়া যেতে পারে। এ পর্যন্ত মাত্র ৩৪টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এরূপ চুক্তি রয়েছে। ব্যবসায়-বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধে সহায়তার জন্য আরো অধিকসংখ্যক দেশের সঙ্গে এ চুক্তি সম্পাদন করা প্রয়োজন। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর অনুবিভাগ নিচের দুটি আন্তর্জাতিক ফোরামের সদস্য হতে পারে। (1) Base Erosion and Profit Shifting Inclusive Framework (BEPS) এবং (2) Global Forum on Transparency and Exchange of Information for Tax Purposes. ওইসিডি (OECD)-এর অভিভাবকত্বে পরিচালিত এ সংস্থা দুটি মানি লন্ডারিং ও ট্রান্সফার প্রাইসিং সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করে এনবিআরকে সহায়তা করতে পারে। ফলে কর ফাঁকি দিয়ে স্থানান্তরিত অর্থ হিসাব করে এনবিআর জরিমানাসহ কর আদায় করতে পারে। এনবিআরের ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল জোরদার ও সক্রিয় থাকলে বহুজাতিক কোনো সংস্থা চাইলেও অবৈধ উপায়ে অর্থ স্থানান্তর করতে পারবে না।
বিএফআইইউর তথ্য সংগ্রহেও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক দেশ নিজ দ্বৈত নাগরিকদের সম্পদসংক্রান্ত তথ্য প্রদান করে না। যেমন কানাডার কথিত ‘বেগমপাড়ায়’ যেসব বাংলাদেশি আস্তানা গেড়ে ঐ দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন, তাদের কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের তথ্য দিতে কানাডীয় সরকার বাধ্য নয়। তবে বিভিন্ন দেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সঙ্গে এবং জিএফআই ও অন্যান্য অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ রেখে বিএফআইইউ দেশীয় তদন্ত সংস্থাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করতে পারে।
n লেখক : সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান
