সাইফুল ইসলাম হাফিজ
লিবিয়ায় সংকটের শুরু ২০১১ সালের আরব বসন্তের মধ্য দিয়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো জোটের হামলায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হলে দীর্ঘদিনের অভিভাবক সংকটে পড়ে দেশটি। সংকটের প্রায় এক দশক কেটে গেলেও সেই অস্থিরতা এখনো কাটেনি। বরং লিবিয়ার ভাগ্যাকাশে সংকটময় মেঘ আরো ঘনীভূত হয়েছে। প্রশাসন দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে। সহায়তার সুযোগে লিবিয়ার রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে আন্তর্জাতিক ছোট-বড় অনেক শক্তি। যারা তাদের স্বার্থকে সামনে রেখে উভয় পক্ষকেই প্রকাশ্যে ও গোপনে ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে লিবিয়ার রাজনীতিতে বিবদমান দুটি পক্ষ হলো, গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকোর্ড (জিএনএ) সরকার ও লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ) সরকার। জিএনএর নেতৃত্বে আছেন ফায়েজ আল সিরাজ, যাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে জাতিসংঘ, তুরস্ক, ইতালি, কাতার ও সীমান্তবর্তী দেশ আলজেরিয়া। অপরদিকে, এলএনএর নেতৃত্বে আছেন জেনারেল খলিফা হাফতার, যাকে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ফ্রান্স। যদিও ফরাসি সরকার হাফতারকে সমর্থন দেওয়ার কথা বরাবর অস্বীকার করে আসছে। এই বিশ্ব আলোচিত ইস্যুতে পাক্কা খেলোয়াড় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন অবস্থানে আছে, যেখানে থাকলে অস্ত্র-ব্যবসা ও স্বার্থ ঠিকভাবেই হাসিল করা যায়! এই দুপক্ষের বিরোধের সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। লিবিয়ার মাটি ব্যবহার করে তারা আধুনিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। ফলে দেশটির গৃহযুদ্ধ এখন একটা বহুজাতিক যুদ্ধে রূপ নিতে যাচ্ছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির অবসান না হলে লিবিয়া হয়ে যাবে সিরিয়া কিংবা ইয়েমেনের মতো। কিন্তু সম্প্রতি তুরস্ক ও মিশরের আক্রমণাত্বক অবস্থান শীতল যুদ্ধের সমীকরণ পালটে দিয়ে সরাসরি যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত বছরের এপ্রিল থেকে ত্রিপোলি দখলের জন্য অভিযান চালাতে থাকে জিএনএ সরকার। হাফতারের লাগাতার আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে তারা। এখান থেকে শুরু হয় তুরস্কের অনুপ্রবেশ। জিএনএ সরকারের সঙ্গে ২০১৯ সালে একটি সামরিক চুক্তি করে তুরস্ক। বস্তুত, এরপর থেকেই পালটাতে থাকে লিবিয়া যুদ্ধের দৃশ্যপট। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে জিএনএর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে তুরস্ক। এ ছাড়াও লিবিয়ার কয়েকটি তেল কোম্পানির সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বড়সড় চুক্তিও আছে। যেটাকে ভালোভাবে দেখছে না মিশর। সম্প্রতি আল ওয়াতিয়াহ বিমানঘাঁটি ও রাজধানী ত্রিপোলি থেকে এলএনএ-কে হটিয়ে এবার লিবিয়ার সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি আল জুফ্রা এয়ারবেস ও কৌশলগত উপকূলীয় শহর সির্তেকেও (মিশরঘোষিত রেড জোন) নিজেদের দখলে নিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জিএনএ সরকার। তুরস্ক যদি ফের জিএনএর সহযোগিতায় লিবিয়ায় হামলা চালায় তবে সীমান্তবর্তী দেশ মিশরও বসে থাকবে না বলে বিবৃতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ফাত্তাহ আল সিসি। এই দুটি দেশ যুদ্ধে জড়ালে পশ্চিমা দেশগুলো এবং রাশিয়া প্রক্সি যুদ্ধ থেকে সরে এসে জড়িয়ে পড়বে সম্মুখ যুদ্ধে। লিবিয়া হয়ে উঠবে বহুজাতিক যুদ্ধের রণাঙ্গন। কারণ, তাদের মিত্ররা লিবিয়াকে নিয়মিত নজরদারিতে রাখছে। আর যুদ্ধ হলে নিজ দেশের সীমানা ব্যবহার করে অপারেশন চালানো মিশরের জন্য সহজ হবে। এবং বিশ্ব সামরিক র্যাঙ্কিংয়েও তুরস্কের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু তুরস্কের অপারেশন চালানো হবে কঠিন। তিউনিশিয়া ও আলজেরিয়া তাদের বিমানবন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিতে এখনো রাজি হয়নি। ফলে চিন্তিত মস্তিষ্কে বিকল্প উপায় খুঁজছে আঙ্কারা। মূলত, লিবিয়ায় জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আছে দীর্ঘদিন থেকেই। আদতে কেউ-ই তা মানছে না। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কয়েক দিন আগে রাশিয়াও লিবিয়ায় বোমারু বিমানের বহর পাঠিয়েছে। যদিও মস্কো তা অস্বীকার করে আসছে। এই হুমকি আর পালটা হুমকিতে শক্তিশালী ড্রোন আর সাঁজোয়া যান, ফ্রান্স থেকে মিশরের কেনা রাফায়েল যুদ্ধ বিমান এবং রাশিয়া থেকে তুরস্কের কেনা এস-৪০০ মিসাইল যে কোনো মুহূর্তে আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ লিবিয়ার মাটিকে তামায় রূপান্তর করে দিতে পারে। ধ্বংস হয়ে যাবে লিবিয়ার মনোরম কারুকার্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো। তাই, এই আসন্ন একটি বহুজাতিক যুদ্ধ থামাতে বিশ্বের নেতৃবৃন্দের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ২০১১ সালে যারা লিবিয়ার আন্দোলনকে উসকে দিয়ে গৃহযুদ্ধের সূচনা করেছিল আজ তারা কোথায়? সংকট সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারলে শান্তি ফেরাতে কেন উদাসীন? বিশ্বকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে মোতায়েনকৃত অস্ত্রগুলোয় যুদ্ধের দামামা বেজে না ওঠে। এক বসন্তে আরব দেশগুলোয় শুরু হয়েছে অশান্তি। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব করে তুলেছে। এই দেশগুলোর মাটিতে বসন্ত আবার ফিরে আসুক অশান্তি নিয়ে নয়; চির কল্যাণ আর শান্তি নিয়ে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
