ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা, ফরিদপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈরসহ কয়েকটি এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। নড়িয়ায় একটি বিদ্যালয়ের একতলা ভবন নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যদিকে নওগাঁর আত্রাইয়ে পাঁচশ বিঘা জমির পাট ডুবে পচে গেছে। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :
কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) : ঢাকার কেরানীগঞ্জে বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রোহিতপুর, হযরতপুর, তারানগর ও কলাতিয়া এলাকার ১৫টি চলাচলের রাস্তা পানির নিচে ডুবে গেছে। এতে যান চলাচল বন্ধসহ এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছে। গবাদি পশুর খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। উজানের পানির তীব্র স্রোতে লাখির চর এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২১ টি বসতবাড়ি ধলেশ্বরী নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। চার ইউনিয়নের প্রায় ৫৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ১২ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। বুধবার দুপুরে ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম কেরানীগঞ্জের লাখির চর এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করেন। বিদুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩০০ পরিবারকে নগদ পাঁচ হাজার টাকা করে অর্থ সহয়তা দিয়েছেন।
টাঙ্গাইল : জেলায় বন্যার সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল ভোরে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঘারিন্দা ইউনিয়নের নওগাঁ গ্রামের পুংলী নদীর বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ফলে ঐসব এলাকার ফসলি জমি এবং রাস্তা তলিয়ে গেছে। ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক বলেন, বাঁধের প্রায় ২০০ ফুট ভেঙে গেছে। আস্তে আস্তে ভাঙার পরিধি বাড়ছে। টাঙ্গাইল সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান আনছারী জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বন্যার্তদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ভাঙা বাঁধের বিষয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে । টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, বাঁধটি আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ঐ বাঁধে গত চার-পাঁচ দিন কাজ চলছিল। রাতে হঠাত্ করেই বাঁধটি ভেঙে যায়।
নওগাঁ : আত্রাইয়ে আকস্মিক বন্যায় বিভিন্ন মাঠ প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ৫০০ বিঘা জমির পাট কাটতে পারেননি চাষিরা। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ২০৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। কৃষকরা যখন পাট কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন আত্রাই নদের পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করে কয়েক জায়গায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে উপজেলার আহসানগঞ্জ, পাঁচুপুর, বিশা ও কালিকাপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। ফলে এসব এলাকার মাঠের পাট পানিতে তলিয়ে গিয়ে পচে যাচ্ছে। আত্রাই উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ কেএম কাউছার হোসেন বলেন, আমরা বন্যার শুরুতেই কৃষকদের পাট কেটে নিতে বলেছিলাম৬৬। কিন্তু অধিকাংশ জমির পাট অপরিক্ক থাকায় তারা পাটগুলো কাটতে পারেনি।
বেড়া (পাবনা) : পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের পেঁচাকোলা গ্রামের কাছে জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ চুইয়ে যমুনা নদীর পানি ভেতরে ঢুকছে। পাউবো জরুরিভিত্তিতে পানি চুইয়ে পড়ার স্থানে বালুর বস্তা ফেলে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও আতঙ্ক কাটছে না এলাকাবাসীর। যমুনা নদীর পানি বেড়ে চলায় বাঁধের বাইরে বেড়া উপজেলার শতাধিক গ্রাম বন্যায় ডুবে আছে। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার নগরবাড়ী পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপত্সীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ দিকে বেড়া উপজেলায় ঐ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটির প্রায় ১৫ কিলোমিটার
সদরপুর (ফরিদপুর): সদরপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারী বর্ষণের ফলে বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ পয়েন্টে পানি ৪ সেন্টিমিটার কমলেও বিপত্সীমার ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারী বর্ষণের ফলে নতুন নতুন এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করে উপজেলা সদর ইউনিয়ন, ভাষাণচর, কৃষ্ণপুর, চরবিষ্ণপুরসহ ৪টি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
চাটমোহর (পাবনা): চাটমোহরে বন্যা পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। গুমানী ও বড়াল নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। তলিয়ে যাচ্ছে ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট। ভেসে যাচ্ছে পুকুর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুক সমান পানি। চলনবিল অধ্যুষিত এ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি এবার ১৯৯৮ সালের চেয়েও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা। উপজেলার নিম্নাঞ্চল ছাপিয়ে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে চাটমোহর পৌর শহরে। এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ দেওয়া হয়নি। বানভাসিরা চরম সংকটে দিন পার করছে। তবে উপজেলায় প্রায় ১৯ হাজার পরিবারকে ভিজিএফের চাল দেওয়া হয়েছে।
ভেদরগঞ্জ (শরীয়তপুর) : নড়িয়া উপজেলার চরআত্রা ইউনিয়নে ৮১ নম্বর বসাকের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক তলা ভবনসহ ৫০ টি বাড়ি ঘর পদ্মা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। গতকাল সকালে ভবনটি পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, ঐ এলাকায় নদীভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলেছি। কিন্তু, পদ্মার তীব্র স্রোতের কারণে সবকিছু ভেসে গেছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের আরো একটি ভবন ও শতাধিক বাড়িঘর পদ্মার ভাঙনের হুমকিতে আছে।
গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় নদনদীর পানি বুধবার আরো কমেছে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘটের পানি এখনো বিপত্সীমার অনেক ওপরে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার ৪টি উপজেলার ৬৫টি চরাঞ্চলের বসতবাড়িগুলো দীর্ঘদিন বন্যার পানিতে নিমজ্জিত থাকায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের কারো ঘরের বেড়া, খুঁটি, টিনের চাল পানিতে ভেসে গেছে।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল): বন্যায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পুরাতন রোডসহ আঞ্চলিক সড়কগুলো তলিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উপজেলা সদরের কুমুদিনী হাসপাতালসহ বিভিন্ন রোডে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। ফলে পৌরসভা ও উপজেলা সদরের সঙ্গে ১১ ইউনিয়নের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এলাকার অন্তত তিন লাখ মানুষ।
দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে জামালপুরের বন্যা পরিস্থিতি
জামালপুর: জামালপুরে বন্যার পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে। যমুনা নদীর পানি কমলেও বাড়ছে ব্রহ্মপুত্রের পানি। বন্যার পানির কারনে দুর্ভোগ বেড়েই চলছে বানভাসী মানুষের। প্রতিদিন বন্যার্তদের দুর্ভোগ কমাতে ত্রান বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে জেলা প্রশাসন।
