ঈদ মানে সামাজিক আনন্দের এক অপার ফল্গুধারা; কিন্তু করোনা আসিয়া এইবার এমন অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি করিয়াছে যে, অধিক সামাজিক হওয়াটাই এখন সবচাইতে বড় বিপদ। করোনা মানুষে-মানুষে সামাজিক সেতুবন্ধের প্রতিবন্ধক। আমরা তো একটি ভ্যাকসিন না আসা অবধি দম বন্ধ করিয়া ঘরে খিল দিয়া বসিয়া থাকিতে পারি না। মহামারির পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা অন্তত যাহা করিতে পারি, তাহা হইল—সামাজিক দূরত্ব যতটা সম্ভব বহাল রাখা এবং জনসমাগমে মাস্ক পরা। প্রথমদিকে যেমন ধারণা করা হইয়াছিল, করোনা মৌসুমি ভাইরাস। গরম আসিলে প্রকোপ কমিবে; কিন্তু বিধি বাম। কয়েক দিন পূর্বে জানা গিয়াছে, ইহা মৌসুমি ভাইরাস নহে, সমগ্র বত্সরই ইহার প্রকোপ থাকিবে। বাংলাদেশে গত ১৮ মার্চ করোনা ভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করিয়াছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ১০ জুন এই সংখ্যা ১ হাজার এবং ৫ জুলাই তাহা ২ হাজার অতিক্রম করে। অতঃপর গত ২৭ জুলাই মৃত্যুর সংখ্যাটি ৩ হাজার ছুঁইয়াছে। জুলাই মাসে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হইয়াছে। প্রতিটি মাস পূর্বের মাসের রেকর্ড ভাঙিতেছে এবং লাফাইয়া বাড়িতেছে।
ব্যাপক জনঘনত্বের দেশ হিসাবে বাংলাদেশে সামাজিক দূরত্ব মানিয়া সকল সময় সকল নিয়ম পালন করা সম্ভব নহে। বাংলাদেশের চাইতে অনেক কম জনঘনত্বের অনেক বড় দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা পর্যন্ত এই নিয়ম ঠিকমতো পালন করিতে পারিতেছে না। ইহাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়াছে গ্লোবাল কোভিড-১৯ ইনডেক্সে (জিসিআই)। সেইখানে ১৮৪টি দেশের মধ্যে বর্তমানে ১৩১তম অবস্থানে রহিয়াছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের চাইতে ভালো অবস্থানে রহিয়াছে পাকিস্তান, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভারত। কেবল মালদ্বীপের অবস্থা আমাদের চাইতেও খারাপ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনা দক্ষতার এই সূচকটি তৈরি করিয়াছে কুয়ালালামপুরভিত্তিক কনসাল্টিং ফার্ম পেমান্ডু অ্যাসোসিয়েটস। সেইখানে দেখা গিয়াছে, করোনা মোকাবিলায় সবচাইতে ভালো পারফরম্যান্স করিয়াছে থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ১০টি দেশের তালিকায় রহিয়াছে মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, বাহামার মতো দেশ। অদ্ভুত ব্যাপার হইল, এই তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে রহিয়াছে সুইডেন। অর্থাত্ সুইডেনের মতো উন্নত দেশও তাহারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনার কারণে সর্বনিম্ন তালিকায় রহিয়াছে। অনেকে বলিতেছে, সুইডেন হার্ড ইমিউনিটির পরিকল্পনা করিয়াছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অনেকে এই কথাই বলিতেছেন। যদিও সংক্রমণের মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করিতে অনেক বেশি মৃত্যুর খেসারত দিতে হয়। হার্ড ইমিউনিটির সবচাইতে ভালো উপায় ভ্যাকসিন। তবে ভ্যাকসিন কবে আসিবে, তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা সম্ভব নহে, তাহা যতই রাশিয়া বা অক্সফোর্ড বলিয়া থাকুক না কেন।
প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বব্যাপী প্রতিটি দেশের জন্যই অভূতপূর্ব এক চ্যালেঞ্জের কারণ হইয়া উঠিতেছে কোভিড-১৯ মহামারি। কার্যকর অভিজ্ঞতার অভাবে বৈশ্বিক পর্যায়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কাজটি ক্রমেই জটিল হইতে জটিলতর হইয়াছে। তবে আশার কথা হইল, বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে এই সংকট বহুলাংশে কাটাইয়া উঠিতে পারিয়াছে। সচেতনতার যেহেতু বিকল্প নাই, তাই ঈদেও আমরা যেন করোনা মোকাবিলায় সচেতন থাকি।
