গাইবান্ধাসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন নদনদীর পানি কমতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে। তবে বেড়েছে নদীভাঙন। আর দেশের মধ্যাঞ্চলসহ ঢাকার আশেপাশের জেলাগুলোতে কিছু নদনদীর পানি কমলেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ততোটা উন্নতি হয়নি। বন্যার পাশাপাশি নদী ভাঙনেও বিপর্যস্ত মানুষ। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ভেঙে গিয়ে অনেক স্থানেই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃহস্পতিবারও কমেছে। তবে ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি এখনো বিপত্সীমার অনেক ওপরে। অপরদিকে করতোয়া ও তিস্তার বিপত্সীমার নিচে রয়েছে। এদিকে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হাই মণ্ডল জানান, গত এক সপ্তাহে তার ইউনিয়নের বাজে চিথুলিয়া ও চিথুলিয়া দিগর মৌজা দুটির ২০০ পরিবার নদীভাঙনে গৃহহারা হয়েছে। মাসব্যাপী এই বন্যায় তার ইউনিয়নের ৬৫৬টি পরিবার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ১৪ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপরে এবং ঘাঘট নদীর পানি ৯ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অপরদিকে করতোয়ার পানি ২৪ ঘণ্টায় ১১ সেন্টিমিটার এবং তিস্তার পানি ১ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়েছে।
গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ কে এম ইদ্রিস আলী জানান, নতুন করে আরো ৯০ মেট্রিক টন চাল ৬ উপজেলার বন্যার্তদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চাল বিতরণও শুরু হয়ে গেছে। এ নিয়ে মোট ৬০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হলো।
মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ নদী ও কুমার নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার ৪৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ভাঙন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল, শুকনা খাবার, শিশু খাদ্য ও গবাদি পশু খাদ্য বিতরণ করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্র জানায়, জেলার ৪টি উপজেলায় ৩৩ হাজার ৭০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শিবচর, সদর, কালকিনি ও রাজৈর উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ পরিবার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ২১টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে ১ হাজার ৭০০ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় ৭টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে।
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, নরসিংদীতে সুরমা-মেঘনা নদীর পানি গতকাল বৃহস্পতিবার ৯ সেন্টিমিটার কমে বর্তমানে বিপত্সীমার ৩৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গেজ পাঠক মো. ইকবাল হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পানি কমলেও রায়পুরা উপজেলার বাঁশগাড়ী ও চানপুর ইউনিয়নে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
ঈশ্বরগঞ্জে ৬০ বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের মরিচারচর নতুন চর ও মলামারি এলাকার পানিবন্দি ৩০০ পরিবার খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গো-খাদ্যের সংকটে পড়েছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে জেলা পরিষদ উপজেলা চেয়ারম্যান মাহমুদ হাসান সুমন ইতিমধ্যে ঢেউটিন, ঈদ উপহারসামগ্রী, নগদ অর্থ বিতরণ করেছেন। গত এক সপ্তাহে মরিচারচর, মলামারি গ্রামের ৬০টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মরিচারচর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে মরিচারচর নতুন চর এলাকা মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। চরাঞ্চলের ভিটেমাটি হারা লোকজন ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ইতিমধ্যে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্র নদটি ত্রিশাল উপজেলার কালীবাজারের পাশ দিয়ে সোজাসুজি প্রবাহিত ছিল। কালীবাজার সংলগ্ন মূল নদীতে চর জেগে ওঠায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে মরিচারচর এলাকায় প্রবেশ করায় ফসলি জমি ও বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পূর্বের মূল ধারার মাত্র এক কিলোমিটার নদী খনন করলে মরিচারচরের দশ কিলোমিটার এলাকার ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের মধ্যে খাস জমি বিতরণ, ঈশ্বরগঞ্জের সীমানায় নদী খনন, বেড়িবাঁধ সম্প্রসারণ ও অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে প্রস্তাবনা প্রেরণ করা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম জানান, নদী খননের ব্যাপারে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ভরাট হওয়া নদীর স্থানটি মার্কিং করে দিলেই খনন কাজ শুরু হবে।
মির্জাপুরে খোলা আকাশের নিচে শতশত পরিবার
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় শত শত পরিবার আশ্রয় নিয়েছে খোলা আকাশের নিচে। তারা ঠিকমত ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন। বন্যায় আঞ্চলিক রাস্তাগুলো তলিয়ে যাওয়ায় পৌরসভা ও উপজেলা সদরের সঙ্গে ১১ ইউনিয়নের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার মির্জাপুর পৌরসভার ১, ২, ৩, ৪ এবং ৫নং ওয়ার্ডের কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বন্যা কবলিত শত শত পরিবার বিভিন্ন ব্রিজ-কালভার্ট ও উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন। ভাওড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আমজাদ হোসেন ও মহেড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. বাদশা মিয়া জানান, পৌরসভা, ফতেপুর, লতিফপুর, মহেড়া, জামুর্কি, বহুরিয়া, ভাওড়া, ভাদগ্রাম, ওয়ার্শি, বানাইল এবং আনাইতারা ইউনিয়নের আঞ্চলিক সড়কগুলো তলিয়ে গেছে। রাস্তা-ঘাটের পাশাপাশি মত্স্য খামার, ফসলি জমি, সবজি, গাছপালা, গবাদি পশুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বংশাই ও লৌহজং নদীর পানি এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
নাগরপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, বন্যার পানির নিচে উপজেলার কাঁচাপাকা অধিকাংশ সড়ক। এতে এলাকার মানুষ বিশেষ করে গরুর খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তারা তাদের গরু-ছাগল কোরবানির হাটে সহজে নিয়ে যেতে পারছেন না। গরু ভর্তি ট্রাক সড়কের ভাঙা অংশে এসে ফেসে যাচ্ছে। বন্যার পানির স্রোতে ভেঙে গেছে উপজেলার গয়হাটা-সিংজোড়া সড়কের সেতু। এতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সিংজোড়াসহ আশপাশের ৪ গ্রামের সঙ্গে নাগরপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুর্গত এলাকার গ্রামীণ জনপদের ১০০ কিলোমিটার কাঁচা-পাকা রাস্তা, ২৩টি ব্রিজ কালভার্ট ও ১/২ কিলোমিটার বাঁধ।
