করোনার থাবা : যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ধরাশায়ী প্রায় সবাই

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১:৩১

রিয়াদ হোসেন

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে করোনার থাবায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। স্বাভাবিকভাবেই দেশটিতে চীনের রপ্তানি কমেছে সবচেয়ে বেশি হারে। চীন থেকে সরে যাওয়া রপ্তানি আদেশ বাংলাদেশ বলতে গেলে ধরতে পারেনি। তবে চীনের প্রতিবেশী ভিয়েতনাম ঐ সুযোগ ধরেছে বলে বলা হলেও পরিসংখ্যান তা বলছে না। যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির পোশাক রপ্তানি কমার হার বাংলাদেশের কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক ১০ দেশের মধ্যে কেবল রপ্তানি বেড়েছে কম্বোডিয়ার। গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির তথ্য পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানা গেছে। দেশটির পোশাক ও টেক্সটাইল আমদানি রপ্তানির তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওটেক্সা এ হিসাব করেছে। ওটেক্সার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯১৯ কোটি ডলার বা প্রায় ২৮ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে দেশটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট আমদানি করেছে ২ হাজার ৯৯২ কোটি ডলারের পোশাক পণ্য। এর আগের বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩১২ কোটি ডলারের।

এই বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থা তুলনামূলক কম খারাপ। দেশটিতে আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩১ কোটি ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন থেকে পোশাক পণ্য আমদানি কমেছে ৪৯ শতাংশেরও বেশি। দেশটিতে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের রপ্তানি কমেছে ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। চতুর্থ অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ার কমেছে ১৫ শতাংশ, ভারতের ২৭ শতাংশ, মেক্সিকোর সাড়ে ৩৭ শতাংশ, হন্ডুরাসের প্রায় ৪৩ শতাংশ, পাকিস্তানের প্রায় ১৬ শতাংশ  এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ২৭ শতাংশ। একমাত্র কম্বোডিয়ার বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ।

চীনে জানুয়ারিতে করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকায় আমদানি রপ্তানিতে গতি মন্থরতা দেখা দিতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারিতে তা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ ও আমেরিকায়। মার্চে শুরু হয় বাংলাদেশেও। এই সময়ে যোগাযোগ সংকুচিত হয়ে আসে বিশ্বব্যাপী। ফলে খাদ্যপণ্য ও ওষুধ বাদে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য পণ্যের মতো পোশাকের চাহিদাও তলানিতে নামে। লকডাউনের কারণে বন্ধ হয়ে যায় খুচরা দোকান। ফলে সব দেশ থেকেই রপ্তানিও ব্যাপকভাবে কমে যায়। অবশ্য মে মাস থেকে বাংলাদেশে উত্পাদন কার্যক্রম শুরু করার পর ফের রপ্তানি বাড়তে থাকে। জুনে এসে রপ্তানিতে বেশ ভালোভাবেই ফিরে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জুলাইয়েও রপ্তানিতে ভালো গতি রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের নিটওয়্যার পোশাক পণ্য উত্পাদনকারী ফতুল্লা গার্মেন্টস যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছে রপ্তানি করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, দেশটির ক্রেতাদের কাছে তার রপ্তানি আদেশ রয়েছে। তবে কিছুটা কমেছে। অবশ্য গত ফেব্রুয়ারি থেকে দুই তিন মাস সেখানে পোশাক বিক্রি না হওয়ায় আগামী গ্রীষ্মের ক্রয়াদেশ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের পণ্য স্টকে রয়ে গেছে। ফলে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে যেসব ক্রয়াদেশ আসার কথা, তা হয়তো খুবই কম আসবে। একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন অন্যতম বড় রপ্তানিকারক স্টারলিং গ্রুপের প্রধান ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, আগামী দুই তিন মাস পর যেসব পোশাক তৈরি হবে, তার আলোচনা এখন থেকেই হওয়ার কথা। কিন্তু  সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

অবশ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রপ্তানির সবচেয়ে বাজে সময় বাংলাদেশ পার করে এসেছে। আগামী দিনগুলোতে পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারায় ফিরবে। হয়তো তা অতীতের বছরের একই সময়ের মতো হবে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ইত্তেফাককে বলেন, এরই মধ্যে গত জুন থেকে পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উত্সব বড় দিনকে কেন্দ্র করেও ভালো রপ্তানি আদেশ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা এবং চীন মার্কিন বিদ্যমান দ্বন্দ্বের কারণে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়াদেশ ব্যাপকভাবে সরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশকে চেষ্টা করতে হবে ঐ ক্রয়াদেশ ধরার। এজন্য দ্রুত করোনা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।