সমালোচনা যদি সত্য উদ্ঘাটনের জন্য হয় তাহলে সেই তীরের আঘাত যতই বেদনাদায়ক হোক সেটা সহ্য করা উচিত। সম্প্রতি আমাদের স্বাস্থ্য খাত কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিবিশেষের কারণে যে অবস্থায় পতিত হয়েছে তা কারো কাম্য ছিল না; কিন্তু যা ঘটেছে তা যেমন সত্যি আবার এ খাত নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে তাতেও বাহুল্য লক্ষ্য করা গেছে। তবে এই সমালোচনা যদি শুধুই সমালোচনার জন্য হয়, তবে সেটা স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতিকেই আখেরে ব্যাহত করবে।
উল্লেখ্য, ২০১৯-এর শেষের দিকে চীনের উহান থেকে করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর আমরা আক্রান্ত হলাম—মার্চ ২০২০ নাগাদ। বিশ্বের ছোট-বড় প্রতিটি দেশ করোনা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর অবস্থা আরো বেশি সংকটাপন্ন। এখনো পর্যন্ত আশার কথা এই যে, অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া সত্ত্বেও করোনায় আমাদের দেশে মৃত্যুহার বিশ্বের সবচেয়ে কম। যদিও আমাদের এই অবস্থান নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক ও সংশয়। কেউ বলছেন, টেস্টের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছি না। কারো মতে, সঠিক তথ্য আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। যদি এমনটাই হতো, তাহলে হাসপাতাল খালি রেখে কবর খুঁড়তেই আমাদের হিমশিম খেতে হতো।
করোনা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির মতো দেশ করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যু হারে যখন বেসামাল পরিস্থিতিতে পড়েছে তখন বাংলাদেশে আক্রান্তের হার ক্রমান্বয়ে বাড়লেও একপর্যায়ে সেটি নিয়ন্ত্রণে চলে আসা শুরু করে। জুনের শেষ এবং জুলাইয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যু হার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও পরে আবার তা নিয়ন্ত্রণমুখী। তখন মৃত্যুর হার ছিল মাত্র এক শতাংশ এবং যারা নমুনা দিয়েছেন তাদের মধ্যে আক্রান্তের হার ২২-২৩ শতাংশ। আর আক্রান্তদের মাত্র ৫ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। যার কারণে কোভিড আক্রান্তদের জন্য বরাদ্দকৃত হসপিটালের শয্যাও খালি রয়ে গেছে। জুলাইয়ের শেষে করোনা আপডেটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী আক্রান্ত হাজারের নিচে এবং মৃত্যু হারেরও রেকর্ড কম ছিল। ঈদের পরে ঘরমুখী মানুষ কর্মস্থলে ফিরলে পুনরায় এটি বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলেও স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন—আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সাময়িক কিছুটা বাড়লেও সেটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই থাকবে।
উল্লেখিত অর্জনগুলো সম্ভব হয়েছে সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণেই। সময়মতো সচেতনতা তৈরিসহ প্রয়োজন অনুযায়ী লকডাউন তথা বিধিনিষেধ আরোপ এক্ষেত্রে কাজে দিয়েছে। সরকার কর্মস্থলে মানুষের অংশগ্রহণকেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক করোনা পরিস্থিতির বিবেচনায় শিথিল ও কড়াকড়ি—এই দুই পর্বে অত্যন্ত সময়োপযোগীভাবে দক্ষতার সঙ্গে করেছিলেন। কঠোর লকডাউনের সময় সরাসরি অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানের ব্যাপারটিতেও সরকার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক প্রণোদনা সহায়তার স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, চিকিত্সকদের নির্ভয়ে কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে কাজে নিবেদিত করার ব্যাপারটিও এই সরকার করেছে দূরদর্শিতার সঙ্গে। এ ব্যাপারে সরকার অনতিবিলম্বে পাবলিক ও প্রাইভেটসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতের সমন্বিত সহযোগিতার মাধ্যমে কাজটিকে এগিয়ে নিতে মাঠে নামেন। মধ্য এপ্রিলেই বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে করোনা যুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা—পাবলিক ও প্রাইভেট চিকিত্সকদের ১০ হাজার পিপিই প্রদানসহ কর্মস্থলে ডাক্তারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সাফল্যের দিকগুলো তুলে ধরে অনুপ্রেরণা ও সাহস যোগানের কাজটিও করেন। অ্যাসোসিয়েশন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশ ও নেতৃত্বে চিকিত্সকদের সুরক্ষায় বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিত্সা ব্যবস্থার বিষয়টিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে।
বিগত ১০ বছরে স্বাস্থ্য খাতের অর্জন তথা সাফল্যগুলোকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অনেক সাফল্য রয়েছে আমাদের, সেটা যেমনি এই করোনাকালীন সময়ে, তেমনি আগেও। আগে দেশে হাসপাতাল ছিল হাতেগোনা। সেই অবস্থা থেকে বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলায় হাসপাতাল করা হয়েছে। ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে গেছে। দেশে এরই মধ্যে গুণমানের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রতিটি বিভাগে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিটি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আট বিভাগে আটটি ক্যানসার হাসপাতাল করা হচ্ছে। ১০ হাজার চিকিত্সক, ১৫ হাজার নার্সসহ পর্যাপ্ত জনবল প্রস্তুত করা হচ্ছে। বিগত ১০ বছরে এই বিষয়সহ আরো বিভিন্ন সময়োপযোগী কার্যকর পদক্ষেপের কারণেই স্বাস্থ্য খাতে এজাতীয় বহুবিধ অর্জন আমাদের রয়েছে।
বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের কারণেই দেশে শিশুর অপুষ্টির হার যেমন হ্রাস পেয়েছে, তেমনি কমেছে মৃত্যুর হারও। মৃত্যুর হার এখন অর্ধেকেরও নিচে। আমাদের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের হার ঈর্ষণীয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগের কাছাকাছি। যেমন বিসিজি টিকা প্রদানের হার ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি এবং ফলপ্রসূ। একই সঙ্গে সাফল্য রয়েছে প্রসূতি মৃত্যুর হার কমার ক্ষেত্রেও। প্রসূতি মৃত্যুর হার এখন প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৭৬ জনে নেমে এসেছে। দেশের মানুষের গড় আয়ূও ৭২ দশমিক ৩ বছর, যা অনেক দেশের তুলনায় বেশি। নিরাপদ প্রসূতি ও শহর-গ্রাম—সর্বত্র টিকাদান কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। দেশের স্বাস্থ্যসেবার অভূতপূর্ব এসব উন্নতির স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের মর্যাদাশীল পুরস্কার ভ্যাকসিন হিরো, জাতিসংঘ ডিজিটাল হেলথ-২০১১, সাউথ সাউথ, এমডিজি গোল অর্জনসহ বিপুলসংখ্যক পুরস্কার বয়ে এনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন।
বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে অনেক রকমের দুর্নীতি কমবেশি ছিল, আছে। সেগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে; কিন্তু সেটা বন্ধ করার একটা সুস্থ প্রক্রিয়া আছে। অন্য কোনো এজেন্সি দিয়ে এটি নির্মূল করা যাবে না। মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। হাসপাতালে কী কী সমস্যা তারা ভালো করেই বোঝেন। বেসরকারি হাসপাতালে দুর্নীতি হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেখানে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের লোক পাঠিয়ে বিষয়গুলো তদারকি করা যায়; কিন্তু সেটা না করে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এটা কোনো সমাধান নয়। এতে বেসরকারি হাসপাতালের বিষয়ে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে।
১০-১৫ বছর আগেও হার্টের সমস্যা হলেই আমরা বিদেশে যেতাম। যাদের টাকাপয়সা আছে তারা ব্যাংকক, সিঙ্গাপুরে এবং যাদের টাকাপয়সা একটু কম তারা ভারতের দিল্লি বা মাদ্রাজে। আর যারা একেবারেই গরীব তারাও জায়গাজমি বিক্রি করে হলেও দেশের বাইরে গিয়ে ডাক্তার দেখাত। আমাদের দেশের প্রাইভেট সেক্টরের কিছু হাসপাতালের কারণে এটি এখন কমে এসেছে। যদিও সব হাসপাতালের সেবার মান যেমন এক নয়, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন অভিযোগ-অসন্তোষও। তাই যাদের মান ভালো নয় তাদেরকে শনাক্ত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে; কিন্তু সম্প্রতি ব্যক্তিবিশেষের দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে আমরা এমন ঢালাও প্রচার করছি—যেন সব হাসপাতালেই ভুয়া টেস্ট হচ্ছে। যেখানে দুর্নীতি-অনিয়ম সেটা অবশ্যই বলতে হবে; কিন্তু মানুষের কাছে যেন ভুল বার্তা না যায়—সেটাও দেখতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যখাতের প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা কষ্টকর হবে বইকি।
n লেখক :গণমাধ্যম সমন্বয়ক শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশন।
