ক্ষোভে ফুঁসছে বৈরুতবাসী

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২০, ২৩:০৩

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে গত মঙ্গলবার ভয়াবহ বিস্ফোরণের জন্য সরকারের অবহেলা ও ‘কাণ্ডজ্ঞানহীনতা’কে দায়ী করছে সেখানকার বাসিন্দারা। তারা সরকারের কাছে এই গাফিলতির ব্যাখ্যা দাবি করেছে। যারাই দায়ী, তাদের বিচার দাবি করেছে। চারদিকে প্রকাশ্য ক্ষোভ দৃশ্যমান এই শহরটিতে। প্রত্যেকের মুখে একই প্রশ্ন—এটা কি জেনে শুনে মানুষ হত্যা করা নয়? রাসায়নিক পদার্থ ঝুঁকিপূর্ণভাবে জড়ো করে রাখলে যদি দুর্ঘটনা ঝুঁকি থাকে, তাহলে সেগুলো রাখা হলো কেন? এর জবাব তো দায়িত্বশীল কাউকে দিতে হবে। গণমাধ্যমগুলো বলছে, এখনো সেখানকার মানুষের বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি। এ যেন ছিল এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের দিন। দিনের বেলায় বিস্ফোরণ না হয়ে রাতে ঘটলে প্রাণহানি আরো বেশি ঘটত বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।           বৈরুত কাঁপানো সেই বিস্ফোরণে এখনো পর্যন্ত ১৩৫ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে আরো ৪ হাজারের বেশি। এই ঘটনার পর লেবাননে দুই সপ্তাহের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। ঘোষণা করা হয় তিন দিনের শোক। অপরদিকে, বিধ্বস্ত শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ ও বিস্ফোরণে সৃষ্ট ভূমিকম্পে ধসে পড়া বিভিন্ন ভবনের ইট-কাঠ, কাচের টুকরাসহ অন্যান্য আবর্জনা পরিষ্কার করছে শত শত স্বেচ্ছাসেবী। গতকাল আকস্মিক সফরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি বৈরুতবাসীর সঙ্গে থাকার ঘোষণা দেন। তাকে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ জানাতে গেলে সেখানে হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তিনি স্বজনহারা ও ক্ষতিগ্রস্তদের শান্ত্বনা দেন।

বৈরুতের অধিবাসী চাদিয়া এলউচি এই মুহূর্তে হাসপাতালে জখমের বিরুদ্ধে লড়ছেন। সাংবাদিকদের পেয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি সবসময়ই জানতাম কতগুলো অযোগ্য লোক আর অযোগ্য সরকার এই দেশ পরিচালনা করছে। আমি বলতে চাই, এখন তারা যেটা করেছে সেটা ভয়ংকর অপরাধ। তাহলে যেন এই অপরাধীদের বিচার হয়। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস আর যেন কেউ না পায়।’

এদিকে, দেশটির সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিল বলেছে, দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হবে। অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিস্ফোরণের ঘটনায় স্বতন্ত্র তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তারা সরকারি তদন্তের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছে।

ব্রিটেনের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা শহরে যে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল, সেটির দশ ভাগের এক ভাগ শক্তি ছিল বৈরুত বিস্ফোরণের। তারা বলছেন, বৈরুতের এই বিস্ফোরণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বোমা বহির্ভূত বিস্ফোরণ। গুদামটিতে যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ছিল তা ছয় বছর ধরে অনিরাপদ অবস্থায় সেখানে রাখা হয়েছিল।

‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননের কর্মকর্তারা বিস্ফোরণের জন্য যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটকে দুষছেন, সেটি আসলে লেবাননের নয়। বরং রাশিয়ার মালিকানাধীন একটি পণ্যবাহী জাহাজে করে লেবাননে পৌঁছেছিল। ছয় বছরেরও বেশি সময় আগের ঐ ঘটনায় মোজাম্বিকে যাওয়ার পথে থাকা ঐ রুশ জাহাজ ছিদ্র হয়ে যাওয়ায় লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বন্দরে ভেড়ে। জাহাজটিতে বহন করা হচ্ছিল ২ হাজার টনের বেশি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। সার বানাতে কিংবা বোমা তৈরির কাজে এই রাসায়নিক ব্যবহার হয়। জাহাজটির আর গন্তব্যে ফেরা হয়নি। অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিরোধের কারণে যে রুশ ব্যবসায়ী জাহাজটি লিজ নিয়েছিলেন তিনি চুক্তি বাতিল করেন। এরপরই জাহাজের অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বৈরুতের বন্দরের কাছের একটি গুদামে নেওয়া হয়। এতবছর ধরে সেখানেই তা পড়ে ছিল।

লেবাননের আইনপ্রণেতা সেলিম আউন সরকারি নথির বরাত দিয়ে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এই দাহ্য পদার্থ কীভাবে সরানো হবে সে পরামর্শ চেয়ে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত লেবাননের কাস্টমস কর্মকর্তারা আদালতে অন্তত ছয়বার চিঠি লিখেছেন। তারা ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট রপ্তানি করা কিংবা লেবাননের সেনাবাহিনীকে তা অনুদান হিসাবে দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। কিন্তু বিচার বিভাগ তাদের চিঠির কোনো জবাব দেয়নি। বৈরুত বন্দরের জেনারেল ম্যানেজার হাসানও বুধবার এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, কাস্টমস এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বারবার অনুরোধের পরও ‘কিছুই হয়নি’। তিনি বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, ঐ পণ্য নিলামে বিক্রি করা হবে। কিন্তু তা আর কখনো হয়নি। বিচার বিভাগও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’

জানা গেছে, বিস্ফোরণের ঘটনায় হতাহতের পাশাপাশি প্রায় ৩ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছেন এবং লেবাননের মজুত খাদ্যশস্যের ৮৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি আমদানি করা খাদ্যশস্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। খাদ্যশস্যের এখন যা মজুত আছে তা দিয়ে দেশটি বড়জোর আর এক মাস চলতে পারবে বলে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।