আলোকপাত

করোনায় সাফল্য :বিমান বাহিনী ঘাঁটি বাশার

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২০, ২১:২৪

গ্রুপ ক্যাপ্টেন মাহমুদ মেহেদী হুসেইন, পিএসসি

করোনা সংক্রমণ রোধে বাংলাদেশ সরকার এবং বিমান সদরের বিভিন্ন নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘাঁটির সদস্যদের জন্য গত ২০ মার্চ ২০২০ তারিখে গঠন করা হয় ‘করোনা স্ক্রিনিং সেন্টার’ ও ‘করোনা মনিটরিং সেল’। ঘাঁটির বাইরে থেকে আসা, ভেতরে অবস্থানরত, ছুটি অথবা বিদেশফেরত বিমান বাহিনীর যে কোনো সদস্যকে প্রথমেই ‘করোনা স্ক্রিনিং সেন্টার’ থেকে প্রাথমিক নিরীক্ষণ করে পরিস্থিতি ও উপসর্গ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় চিকিত্সা এবং কোয়ারেন্টাইন অথবা আইসোলেশনে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে। এরপর ‘করোনা মনিটরিং সেলে’র তত্ত্বাবধানে তাদেরকে পূর্বঘোষিত কোয়ারেন্টাইন অথবা আইসোলেশন সেন্টারে স্থানান্তর করে খাদ্য, চিকিত্সা, বিনোদনসহ সার্বিক দেখভাল করা হয়। প্রয়োজনবোধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য সিএমএইচে  পাঠানো হয়। উল্লেখ্য, রোগের উপসর্গ অনুযায়ী সন্দেহযুক্ত রোগীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের কোয়ারেন্টাইন অথবা আইসোলেশন সেন্টারের ব্যবস্থা করা হলেও শুরুতে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা ছিল না। এ অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সুচিকিত্সার জন্য সিএমএইচে পাঠানো হতো। কিন্তু দিন দিন করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ঘাঁটি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একটি অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করে এবং মৃদু লক্ষণযুক্ত (পজিটিভ) রোগীদের এ হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিত্সা দেওয়া শুরু করে। এযাবত্ প্রায় অর্ধশত করোনা আক্রান্ত রোগী, দেড় শতাধিক সদস্য আইসোলেশন এবং সাত শতাধিক সদস্য কোয়ারেন্টাইন কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ১২৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কনটিনজেন্ট সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক (CAR)-এ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য মনোনীত হলে গত ১০ মে ২০২০ তারিখে সিএমএইচ-এ তাদের কোভিড-১৯ টেস্ট করানো হয়। মোট ৩৯ জনের করোনা পজিটিভ নিশ্চিত হলে তাদের মধ্যে স্বল্প থেকে মাঝারি লক্ষণযুক্ত মোট ২৯ জনকে বিমান বাহিনীপ্রধানের নির্দেশনায় সিএমএইচে না পাঠিয়ে ঘাঁটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্মিত অস্থায়ী হাসপাতালে রেখে চিকিত্সা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক চিকিত্সা মহাপরিদপ্তরের প্রটোকল অনুযায়ী এই ঘাঁটির চিকিত্সকরা আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসেবা প্রদান শুরু করেন। পাশাপাশি ঘাঁটি কর্তৃক আক্রান্ত ব্যক্তিদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় :

ক. প্রতিদিন দুই ঘণ্টা পরপর গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করা এবং গরম পানির বাষ্প নেওয়া, খ. প্রতিদিন সকাল ১০-১১টার মধ্যে খালি গায়ে রোদে আধঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করা, গ. নিয়মিতভাবে পুষ্টিকর খাবার, যমন—মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ খাওয়া, ঘ. প্রতি বেলায় খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফলমূল খাওয়া, ঙ. মধু, কালিজিরা, আদা, গরম চা ইত্যাদি নিয়মিতভাবে  খাওয়া।

বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এ জনবল সময়মতো পাঠানো ছিল বিমান বাহিনীর জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের জন্য বিমান বাহিনীপ্রধানের সময়োপযোগী ও কার্যকরী নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিমান বাহিনী ঘাঁটি বাশার যেভাবে সফল হয়েছে তা বিমান বাহিনীর ভাবমূর্তি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসার দাবি রাখে। এ অবস্থায় দেশবাসীর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে যে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের হাসপাতালে না পাঠিয়ে, যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ও চিকিত্সা দিয়ে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। আর এতে করে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের চিকিত্সাসেবা সহজতর হবে। করোনার ভয়াবহতায় হতবিহ্বল না হয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক স্বল্প থেকে মাঝারি লক্ষণযুক্ত করোনা আক্রান্ত রোগীদের অস্থায়ী হাসপাতাল অথবা ঘরে রেখে চিকিত্সা করানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি বাশারের অস্থায়ী হাসপাতালটি হতে পারে একটি রোলমডেল।

n লেখক :অধিনায়ক, প্রশাসনিক শাখা,

বিমান বাহিনী ঘাঁটি বাশার