আগস্ট শোকের মাস, বেদনার মাস, বাঙালির আর্তনাদের মাস—একই সঙ্গে শোককে শক্তিতে পরিণত করারও মাস। ১৯৭৫-এর মধ্য আগস্টে কতিপয় বিপথগামী কুচক্রী সেনাসদস্যের হাতে সপরিবারে শহিদ হন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম বাঙালি বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন তারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে মূলত ধ্বংস করতে চেয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা—বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকেই করতে চেয়েছিল বিপন্ন। এ কারণেই তাদের হাত থেকে রক্ষা পাননি বেগম মুজিব, রক্ষা পাননি তরুণ সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, রক্ষা পাননি কিশোর রাসেল। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে যেমন চাপা দেওয়া যায় না সত্যকে, হাত দিয়ে যেমন রুদ্ধ করা যায় না সূর্যের আলো—তেমনি অন্যায় রক্তপাত দিয়ে স্তব্ধ করা যায় না স্বাধীনতার মহান চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের অনির্বাণ সূর্য।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বব্যাপী একজন মহান মুক্তিসংগ্রামী এবং প্রগতিশীল মানবতাবাদী গণতন্ত্রবিশ্বাসী রাজনীতিবিদ হিসেবেই সমধিক পরিচিত। প্রকৃত প্রস্তাবেই তিনি রাজনীতির মানুষ, রাজনীতিই তার জীবনের ধ্যানজ্ঞান। তিনিই বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয়তাবাদী নেতা। বাঙালির সম্মিলিত চেতনায় জাতীয়তাবোধ সঞ্চারে তিনি পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। গণতান্ত্রিক মূল্যচেতনা এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা—এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যই বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদের মূল কথা। বাঙালির শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষাই তার জাতীয়তাবাদের মৌল ভিত্তি।
এই আকাঙ্ক্ষাকেই একক সাধনায় জীবনব্যাপী সংগ্রামে তিনি সঞ্চারিত করে দিয়েছেন বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায়।
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই অভিন্ন ও একাত্ম। বাংলাদেশের কথা বলতে গিয়ে অনিবার্যভাবে এসে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। জনগণের স্বার্থের সঙ্গে দেশের স্বার্থের সঙ্গে নিজের স্বার্থকে তিনি একাত্ম করতে পেয়েছিলেন। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, দেশের স্বার্থের কাছে জনগণের স্বার্থের কাছে তিনি জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন নিজের স্বার্থ। বিশ্ব ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয়তাবাদী নেতার দৃষ্টান্ত বিরল। তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি জাতীয় পুঁজির আত্মবিকাশের আকাঙ্ক্ষা ও বাঙালির সম্মিলিত মুক্তির বাসনাকে মেলাতে পেরেছেন এক মোহনায়। বিশ্ব ইতিহাসে কোনো জাতীয়তাবাদী নেতার কর্মসাধনায় আমরা এই যুগলস্রোতের মিলন লক্ষ করি না।
শোষক ও শোষিতের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শোষিত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে তিনি কখনো দূরে সরে যাননি। ভীতি ও অত্যাচারের মুখেও সর্বদা তিনি সত্যের কথা বলেছেন, শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এই অবস্থানের কারণে তিনি কেবল বাংলাদেশেরই নয়, বিশ্ব মানুষেরই অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন—এসব সংস্থায় শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায়, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর ঐতিহাসিক সেই মন্তব্য ‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনিই হিমালয়। শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হূদয়ের বন্ধুকে।’
প্রতি আগস্টেই বাংলার প্রকৃতিতে আসবে শ্রাবণ, প্রতি শ্রাবণেই বাংলার আকাশ আর্তনাদ করে বৃষ্টি হয়ে কাঁদবে—কেঁদে কেঁদে বলবে বঙ্গবন্ধুর কথা, তার স্বপ্নের কথা, তার সংগ্রামের কথা। হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে একসূত্রে গ্রথিত করেছেন। তিনি আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধুর সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে হলে, শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রকৃত দেশপ্রেম নিয়ে সচেতনতার সঙ্গে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। সেটাই হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের এই শ্রাবণে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ উপায়। [লেখক :বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও রবীন্দ্র গবেষক]
