‘গরু’ বনাম ‘গোরু’

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২০, ২২:০৯

এই কোরবানি ঈদের আগে গরুর দাম নিয়ে আলোচনার চেয়ে ফেসবুকের নিউজ ফিড সরব হয় ‘গরু’ বানান নিয়ে। বাংলা একাডেমি তার নতুন সংস্করণের বাংলা অভিধানে গরুর বানান বদলে দিয়ে করেছে ‘গোরু’। ব্যাকরণবিদরা ব্যাকরণের হিসাবেই তা বদলেছেন হয়তো। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা মানতে রাজি নয়। বৈয়াকরণরা যা-ই ঠিক করুন না কেন, ভাষা সব সময় সাধারণ মানুষের উচ্চারণ ও ব্যবহারকেই অনুসরণ করে। বৈয়াকরণরাও সাধারণ মানুষের মুখের কথাকেই অনুসরণ করে তাদের বানানরীতি ঠিক করে থাকেন। তাই হঠাত্ করে ‘গরু’ বানান ‘গোরু’ হয়ে যাওয়াতে সবার ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে বাংলা একাডেমির ঘাড়ে। দেখা যাচ্ছে, ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি। সেই সময়েই এই বানান বদলে গিয়েছিল। কিন্তু তা নজরে এলো সম্প্রতি, বানান নিয়ে কাজ করা একটি ওয়েবসাইটে তা উল্লেখ করায়।

গরু বানান নিয়ে বিভ্রান্তি কিন্তু আজকের নয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ‘গরু’ ও ‘গোরু’ এ দুটি বানানই ব্যবহার করেছেন। প্রমথ চৌধুরী তার লেখায় ‘গোরু’ বানানটি ব্যবহার করেছেন। আবার রবীন্দ্রনাথ ‘গোরু’ বানান নিয়ে ব্যাকরণবিদদের সঙ্গে অনেক ঠাট্টাও করেছেন। বানান পরিবর্তন প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি বিভাগের   অধ্যাপক ড. নিখিল রঞ্জন বিশ্বাস জানান, শব্দের অন্ত্য অ-কারকে ও-কার ( ে া) দিয়ে লেখা। যেমন, কোনো, ছোটো, বড়ো, ভালো, মন্দো, হতো, যতো, কতো, খেয়েছো, পেয়েছো, গিয়েছো, করেছো, খেয়েছো, ধরেছো, লিখেছো, এগারো, বারো, তেরো, ষোলো ইত্যাদি। এভাবে লিখলে শব্দে একটি বাড়তি ও-কার যোগ করতে হবে। উচ্চারণ অনুসারে যদি বানান লিখতে হয় তাহলে শত শত শব্দে এ নিয়ম প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু সেটি অসম্ভব। যেমন, এক-এ্যাক, তের-ত্যারো, পঁচিশ-পোঁচিশ, বত্রিশ-বোত্রিশ, ছত্রিশ-ছোত্রিশ, অতি-ওতি, করি-কোরি, এত-অ্যাতো, কেন-ক্যানো, সত্য-সোত্ত বা শোত্ত, পরত-পোরতো, ধরত-ধোরতো, করত-কোরতো ইত্যাদি। ‘কোন’ শব্দটিতে ‘কোনো’ লেখা কি খুবই জরুরি? এতে অনাবশ্যকভাবে শব্দটিতে একটি ও-কার যুক্ত হচ্ছে। তাতে লেখা এবং টাইপের সময় বাড়ছে। নিখিল রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, আমরা বানান সংস্কারের বিরোধিতা করি না। কিন্তু যে বানানটি সাহিত্যে এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে তার পরিবর্তন করার কোনো প্রয়োজন দেখি না।

গরু বিভ্রাট

বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে উল্লেখ করা হয়েছে—গোরুকে গরু বলার সবচেয়ে প্রাচীন নজির পাওয়া যায় বড়ু চণ্ডীদাসে, ১৪৫০ সালে। শুধু তা-ই নয়, মূর্খ অর্থে গরু শব্দটি ব্যবহারের নজির পাওয়া যায় ১৮৩০ সালে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত গরুখোর শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন; আবুল মনসুর আহমেদে গরুগাড়ি, জসীমউদ্দীনে গরুদৌড় এমনকি ফরাসি বাবু ওগুস্তাঁ ওসাঁ প্রণীত শব্দকোষে গরুবাছুর আর গরুর মাংসের কথা আছে। তবে ১৬০০ সালে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীকে গোরু বলতেই দেখা যায়। গোরু-খেদার (গরুর মতো তাড়ানো) কথা বলেছেন কবি নজরুল; গোরু-চরা মাঠ, গোরুবাছুর আর গোরুর গাড়ির কথা রয়েছে রবীন্দ্রনাথের লেখায়। তো, গোরু শব্দটি এসেছে সংস্কৃত গোরূপ থেকে। আর গো মানেই ধেনু, গাভি, গোরু; বৃষ, ষাঁড়। গো-র আরো দুটি অর্থ ইন্দ্রিয় ও পৃথিবী। এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির সভাপতি লোকগবেষক শামসুজ্জামান খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘বানান হিসেবে ‘গোরু’ শুদ্ধ। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধানেও ‘গরু’ বানানকে বর্জিত উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধানের সম্পাদক জামিল চৌধুরীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। যেহেতু, সাধারণ মানুষ এ বানানটিকে গ্রহণ করছে না। তাই অভিধানের পরবর্তী সংস্করণে ‘গরু’ বানানটি বিকল্প বানান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’ এদিকে, ‘গোরু’ বানান বদলে গেলেও ‘সরু’, ‘মরু’, ‘তরু’ বানান কী হবে সে কথা বলা হয়নি। শুধু ‘গরু’ বানানই নয় বেশ কিছু বানান বদলে দিয়েছে একাডেমি, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বিধার সৃষ্টি করেছে। অনেকে এতদিনের প্রচলিত বানান রীতি কেন বদল করা হলো তা নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। যেমন—‘বড়’ বানান বদলে হয়েছে ‘বড়ো’, ‘ছোট’ হয়ে গেছে ‘ছোটো’। ‘বয়সী’ হয়েছে ‘বয়সি’, বিদায়ী বদলে হয়েছে ‘বিদায়ি’, ‘ঈদ’ বদলে হয়েছে ‘ইদ’; তবে আগের ‘ঈদ’ বানানকেও বাতিল করা হয়নি। ‘হাওর’ বানান বদলে হয়েছে ‘হাওড়’। কেন তা হলো তা বোধগম্য নয়।

শামুসজ্জামান খান আরো জানান, ‘বানান সংশোধন বিষয়ে অভিধানসংক্রান্ত পরবর্তী বৈঠকেই আলোচনা হবে। এ সময় যদি কারো কোনো পরামর্শ থাকে, সেটা তারা দিতে পারেন। সেসব নিয়েও আলোচনা করে গ্রহণ ও বর্জন করা হবে।’