ইউএনওর স্বাক্ষর জাল করে টাকা উত্তোলন ও ধরা পড়ার পর জমা দেওয়ার ঘটনায় কলাপাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) তপন কুমার ঘোষকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (ত্রাণ প্রশাসন) আবু সাইদ মো. কামাল স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা রুজুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তপন কুমার ঘোষ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে ১ কোটি ১১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন করেন এবং ২৩ জুলাই তা সরকারি হিসাবে জমা দেন। যা সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্যদিকে এ ঘটনায় বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অভিযোগ তদন্তে দুদকের উপপরিচালককে চিঠি দিয়েছেন বলে জানান পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী।
এদিকে এ বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে গত ২২ জুলাই ‘ইউএনও’র স্বাক্ষর জাল করে কোটি টাকা আত্মসাত্!’ এবং ২৩ জুলাই ‘ইউএনও’র স্বাক্ষর জালে ওঠানো সেই কোটি টাকা ফেরত দিলেন ঠিকাদার’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়।
উল্লেখ্য, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ১০টি কমিউনিটি সেন্টার ও ছয়টি ঘাটলা নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বরাদ্দকৃত ১ কোটি ১১ লাখ ৭৫ হাজার ৩৩৫ টাকা করোনা প্রাদুর্ভাবে সরকারি অফিসসমূহ বন্ধ থাকলেও বিল-ভাউচার তৈরি এবং ইউএনওর স্বাক্ষর জাল করে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়। করোনা পরিস্থিতি এবং ইউএনওর বদলিজনিত অনুপস্থিতির সুযোগে অভিনব কায়দায় সব প্রকার জাল কাগজপত্র তৈরি করা হয়। প্রকল্পের কাগজপত্রে দেখা গেছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পিআইও তপন কুমার সুচতুরভাবে এ কার্যক্রম সম্পাদন করেন। সম্প্রতি বদলি হওয়া কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমান (বর্তমানে বরিশাল সদর ইউএনও) এবং কলাপাড়ার বর্তমান ইউএনও আবু হাসানাত মো. শহীদুল হক এ জালিয়াতির প্রমাণাদি পেয়ে ঊর্ধ্বতনদের বিষয়টি জানালে বেরিয়ে আসতে থাকে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘটনা জানাজানি হলে পিআইও তপন সাবেক এবং বর্তমান ইউএনওকে ম্যানেজ করতে নানান তত্পরতা চালালেও তাতে শেষ রক্ষা না হওয়ায় ২১ জুলাই সরকারি হিসাবে উক্ত অর্থ জমা দেওয়া হয়। এদিকে টাকা আত্মসাতের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে আবাসনে বসবাসরত ভুক্তভোগী কয়েক শ মানুষ। তারা তদন্তপূর্বক অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে।
জাল স্বাক্ষরের দায়ে ২০১৬ সালে কারাবরণ করেন পিআইও তপন
কেবল কলাপাড়া ইউএনওর স্বাক্ষর জাল কিংবা জালিয়াতির কাগজপত্র তৈরি নয় ইতিপূর্বে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত থাকাকালে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে কারাবরণ করেন পিআইও তপন। ২০১৬ সালে তপন কুমার ঘোষ কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় পিআইও পদে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে প্রকল্প সভাপতিদের স্বাক্ষর জাল করে ১০০ মেট্রিক টন সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় দুদকের মামলায় কুষ্টিয়া জেলা ও দায়রা জজ আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এছাড়া ২০১৯ সালে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে পিআইও থাকাকালে তপন কুমার ঘোষের বিরুদ্ধে গ্রামীণ অবকাঠামো (টিআর) প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির ফরমে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মহিবুর রহমানের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ ওঠে। ঐ সময় প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগ ফরমে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাশফাকুর রহমানের স্বাক্ষর জাল করে ধরা পড়েন তিনি। এ ঘটনায় রাঙ্গাবালী থানায় তার বিরুদ্ধে জিডি হয়। রাঙ্গাবালী থানা পুলিশ জানিয়েছে তপন কুমার ঘোষের বিরুদ্ধে দেওয়া লিখিত অভিযোগটি বর্তমানে দুদক তদন্ত করছে। এছাড়া পিআইও তপন সরকারি চাকরিরত অবস্থায় রাঙ্গাবালী আগুনমুখো কিন্ডারগার্টেন নামের একটি বেসরকারি স্কুল পরিচালনাকালে ঐ কিন্ডারগার্টেনের নামে লাখ লাখ টাকার টিআর কাবিখার ভুয়া স্কিম দেখিয়ে তা আত্মসাত্ করেন বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়।
