লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যা

গড়ে তুলেছিল ৩ বন্দিশালা বোটে পাঠাত ইতালি

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২০, ২৩:৫৬

চলতি বছরের মে মাসে লিবিয়ার মিজদাহ শহরে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা অতিরিক্ত টাকার জন্য তাদের বন্দিশালায় জিম্মি করা ২৬ বাংলাদেশিসহ মোট ৩০ জনকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছিল। আহত হয়েছিল আরো ১১ বাংলাদেশি। আর এই বন্দিশালা দেখভাল করত বাংলাদেশের শরীয়তপুরের বাসিন্দা মো. মনির হাওলাদার ওরফে মনির হোসেন। গুলি বর্ষণের ঘটনার কিছু দিন আগে মনির হাওলাদার দেশে এসে লকডাউনে আটকা পড়ে। ফলে সে দেশ ত্যাগ করতে পারেনি। আর লকডাউনে আটকা না পড়লে কোনোভাবেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারত না। ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছেন মনির হাওলাদার। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান জোনাল টিম বুধবার মনির হাওলাদার ও দালাল সেলিম শিকদারকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। বৃহস্পতিবার তাদের সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।

উল্লেখ্য, লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি নিহত হবার ঘটনায় মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় ২৬টির বেশি মামলা করা হয়। ইতিমধ্যে সিআইডি ও ডিবি পুলিশ ৭১ মানব পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃত মনির হাওলাদার ও সেলিম শিকদার মতিঝিল থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে দায়েরকৃত মামলার এজাহারনামীয় আসামি।

গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃত মনির হাওলাদার লিবিয়ায় মানব পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা। মনির প্রথম দফায় ২০১০ সালে দালালের মাধ্যমে একটি কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে শ্রমিকের চাকরি নিয়ে লিবিয়ায় যায়। পরবর্তী সময়ে আরো দুই দফায় লিবিয়া যায়। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করলেও সে অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির। তীক্ষ বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই লিবিয়ার মিলিশিয়া, সেনাবাহিনী, লোকাল পুলিশের সঙ্গে অবৈধ সখ্যতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। আর এদের সহায়তায় অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর দিয়ে উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে প্লাস্টিক/ফাইবার/কাঠের বোটযোগে লিবিয়া হতে ইতালিতে পাঠাত বাংলাদেশিদের।

উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, মনির হাওলাদার ২০১৮ সাল থেকে লিবিয়ার বেনগাজির মাঝুরি, ত্রিপোলির সুলেমান এবং জোয়ারার গেইমিং ক্যাম্প পরিচালনা করে আসছিল। ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে দালাল শরীফ ও কবিরদের পরিচালিত স্বাধীন ট্রাভেলসের মাধ্যমে অবৈধভাবে শতাধিক লোককে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়াতে পাঠানো হতো মনিরের কাছে। বাংলাদেশ থেকে দুবাই হয়ে লোকজন বেনগাজিতে পৌঁছার পর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হতো বন্দিশালায়। বন্দিশালায় আটকে রেখে উক্ত লোকজনদের আত্মীয়স্বজনের কাছে চুক্তির টাকাসহ অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হতো। প্রচণ্ড মারধর, মারধরের ভিডিও ধারণ ও কান্নার শব্দ মোবাইলে রেকর্ডিং করে পাচার হওয়া লোকদের আত্মীয়স্বজনদের কাছে পাঠানো হতো।

মশিউর রহমান আরো বলেন, মনির হাওলাদারের তত্ত্বাবধানে লিবিয়ায় একাধিক ক্যাম্পে তার নিজস্ব লোকজনের হেফাজতে আরো বেশকিছু বাংলাদেশি প্রতারিত হয়ে বন্দি অবস্থায় আছে। ইতিমধ্যে অন্য মামলায় গ্রেফতারকৃত বাদশাহর মাধ্যমে যোগাযোগ করে কমপক্ষে ১৭ বাংলাদেশিকে মুক্ত করা হয়েছে। তারা ফিরে পেয়েছে তাদের পাসপোর্ট ও পকেট মানি। এ বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স প্রত্যক্ষভাবে তদারকি করছে। এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহে যোগাযোগ অব্যাহত আছে।

অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া গুলশান জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. গোলাম সাকলায়েন বলেন, গ্রেফতারকৃত সেলিম শিকদার ও তাদের অন্য সহযোগীরা মিলে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফেনী ও টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সহজ সরল মানুষদের টার্গেট করত। তাদেরকে ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় যেতে আগ্রহী করত। এরপর তাদের পাসপোর্ট ও ছবিসহ ঢাকায় দালালদের কাছে পাঠিয়ে দিত। এ কাজের জন্য সেলিম কমিশন পেত।