আগস্ট মাস আমাদের শোকের মাস। কিন্তু এবার মহামারির কারণে চারদিকে যে মৃত্যু এবং নানাবিধ বিপর্যয়, তা এই মাসটিকে আরো বেশি দুঃখের মাসে পরিণত করল। এই সামষ্টিক দুর্যোগের ভেতর এই মাসে বঙ্গবন্ধুকে আমরা স্মরণ করি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান দেওয়ার জন্য শুধু নয়, তার জীবন ও কাজ নিয়ে স্মৃতিচারণের জন্য শুধু নয় এবং তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাবার জন্য শুধু নয় বরং এই মুহূর্তে তাঁর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কীভাবে দুর্যোগ মোকাবিলা করব, কীভাবে দেশকে সাম্যের পথে নিয়ে আসব এবং কীভাবে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারব—সেই জন্যও। কারণ, নানাবিধ চাপের মধ্যে যার একটি হচ্ছে দুর্নীতি, আমরা যে কিছুটা হলেও পথ হারিয়ে ফেলেছি, আমরা প্রত্যেকেই যেন স্বার্থপরতার চর্চা করছি, অন্যের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছি। এই অবস্থায় বরাবরের মতো বঙ্গবন্ধু আমাদের পথ দেখাবেন এবং এই আগস্ট মাস শেষ হওয়ার আগেই আমরা যদি কিছু প্রমাণ রাখতে পারি যে, তাঁর আদর্শগুলো ধারণ করার একটা প্রয়াস অন্তত চলছে, তাহলে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করাটা অর্থবহ হবে।
একটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যে একটি গৌরবোজ্জ্বল অতীত ছিল, এখন আর তা চোখে পড়ে না। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন তৃণমূল থেকে আসা পরীক্ষিত, সত্ ও জনদরদি নেতারা। এখন এ কথাটি ব্যাপকভাবে বলা যায় না, এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য। তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান শর্ত লাভ বাড়ানো এবং ক্ষতি কমানো হিসাবেই যেন রাজনীতি চলছে। বাংলাদেশের যে মানুষ অস্ত্র হাতে ’৭১-এ যুদ্ধে নেমেছিল, তারা এখন নিষ্ক্রিয়, তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কয়েকজন ছাড়া আর কেউ নেই। এই অবস্থাটি বঙ্গবন্ধু কখনো মেনে নিতেন না। তার কয়েকটি বই আমাদের কাছে এখন সহজ লভ্য, এই বইগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়লে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও কাজের একটা পূর্বাপর পরিচিতি পাওয়া যায়। যদি তাঁর দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ তাঁর আদর্শ ও কাজের অনুবর্তী হয়, তাহলে বাংলাদেশের এই পরিচয় কেটে যায়। কারণ, তখন মানুষ নিঃশ্বার্থ হয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, নানান কালাকানুনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং মেহনতি খেটে খাওয়া মানুষকে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করলে আমরা দুর্নীতিকে ঘৃণা করব, সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেব না, সর্বক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠা করব, আত্মশক্তির সংহার করব, শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেব এবং সংস্কৃতি থেকে সত্য ও সুন্দরের পাঠ গ্রহণ করব। এ কাজগুলো কঠিন নয়, দীর্ঘ জীবন রাজনীতি করে বঙ্গবন্ধু যদি সেগুলো ধারণ ও কাজে প্রয়োগ করতে পারেন, তাহলে আমরা সেই চেষ্টাটি অন্তত কেন করতে পারব না।
আগস্ট মাস আমাদের শোকের মাস। শোক আমরা অবশ্যই পালন করব কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে পাঠ নিয়ে আমরা অনুপ্রাণিত হয়ে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করব—সেই শক্তি যা বাংলাদেশকে ক্রমাগতভাবে সামনে এগিয়ে নেবে।
লেখক :কথাশিল্পী ও অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
