‘সড়কে ঝরল ২৫ প্রাণ’। ইহা হইতেছে ইত্তেফাকের একটি সংবাদ শিরোনাম। গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সড়ক দুর্ঘটনার একটি চিত্র। তন্মধ্যে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে এক পরিবারের তিন জনসহ নিহত হইয়াছে সাত জন। বিষয়টি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। এইভাবে প্রত্যহ সড়কে মৃত্যুর মিছিল লাগিয়াই আছে। বিশেষ করিয়া দুই ঈদ ও অন্যান্য উত্সব-পার্বণের সময় নাড়ির টানে ঘরমুখী মানুষের চাপ যাত্রাপথে বাড়িলে সড়কে হতাহতের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ এবং ইহার প্রতিকার লইয়া ইতিমধ্যে বহু গবেষণা হইয়াছে। অনেক সুপরামর্শ দেওয়া হইয়াছে। আন্দোলন হইয়াছে। নূতন করিয়া আইনও প্রণীত হইয়াছে। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও সড়কে প্রাণহানি হ্রাস পাইতেছে না।
গবেষকরা বলিতেছেন, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত ও বেপরোয়া গতি। এই জন্য দায়ী মূলত চালকের খামখেয়ালি মনোভাব। প্যাসেঞ্জার বা যাত্রীদেরও দোষ রহিয়াছে। তাহারা গাড়ি জোরে না চালাইলে বলে ড্রাইভার গরুর গাড়ি চালাইতেছে! কিছু রহিয়াছে হেলপার কাম ড্রাইভার। তাহারা যখন-তখন স্টিয়ারিংয়ে বসিয়া পড়ে, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ধার ধারে না। অল্পশিক্ষিত-অশিক্ষিত এমন চালকও আছে, যাহারা সড়কের সাইন-সিম্বল সম্পর্কে অজ্ঞ। গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা লইয়াও আছে এন্তার অভিযোগ। আবার কিছু পথচারী আছেন একেবারেই অসচেতন। তবে সকল কিছুকে ছাড়াইয়া আমরা প্রথমত রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভাবকে দায়ী করিতে চাই। আমাদের পর্যাপ্ত প্রশস্তের রাস্তার যেমন অভাব আছে, তেমনি ফুটপাত, ফুটওভারব্রিজের সংখ্যাও অপ্রতুল। এই ক্ষেত্রে শুধু ঢাকা শহরের কথা চিন্তা করিলে হইবে না, সমগ্র দেশের কথাও ভাবিতে হইবে। আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে এত অধিক বাঁক থাকিবে কেন? রাস্তা কেন হইবে নদীর মতো আঁকাবাঁকা? রাস্তা বানাইতে গিয়া অনেক ক্ষেত্রে বিটুমিন না দিয়া দেওয়া হয় আলকাতরা। কার্পেটিং বা সিলকোট ঠিকমতো করা হয় না। যথানিয়মে তদারক করা হয় না। রাস্তা মেইনটেইনেন্সে থাকে উদাসীনতা। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেই রাস্তা হইয়া পড়ে ব্যবহার অনুপযোগী বা খানাখন্দে ভরা। এই সকল রাস্তায় দুর্ঘটনা তো ঘটিবেই।
পরিসংখ্যান বলিতেছে, ২০১৮ সালের চাইতে গত বত্সর সড়কে প্রাণহানির হার বাড়িয়াছে ১৮ শতাংশ। তাহার কারণ সড়ক লইয়া নিয়মিত সার্ভে করা হয় না। কয়েকটা ইনস্টলমেন্টে ঠিকাদারদের অর্থছাড়ের নিয়ম থাকিলেও অনেক সময় তিনটা ইনস্টলমেন্ট একই সঙ্গে দেওয়া হয়। ফলে সড়ক নির্মাণের কাজ মানসম্পন্ন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শুধু টাকা ভাগাভাগি হয় এবং দলীয় নেতাকর্মীদের পকেট ভারী করা হয়। এই সকল কনট্রাকটর-সাবকনট্রাকটরের নাম ব্ল্যাকলিস্টে উঠিবার কথা। কিন্তু অনিয়ম করিয়াও তাহারা পার পাইয়া যায়। স্বাধীনতার পর আমাদের জেলা ছিল ১৯টি। এখন ৬৪টি। আমাদের বার্ষিক বাজেট ও সম্পদের পরিমাণও বৃদ্ধি পাইয়াছে। আগের তুলনায় প্রশিক্ষিত লোকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাইয়াছে। তাহা হইলে শহর ও গ্রামে উন্নত রাস্তাঘাট গড়িয়া উঠিবে না কেন? কেন রাস্তার হতদশা দেখিতে হইবে? আমাদের সমাজ এখনো একটি আধাসামন্তবাদী সমাজ। এখানে বিভিন্ন জনবল নিয়োগ কীসের বিনিময়ে হয় তাহা আমাদের ভালোমতোই জানা। তাহার পরও আমরা হতাশ হইতে চাই না। তৃণমূল পর্যন্ত রাস্তাঘাট নির্মিত হইয়াছে বটে, এখন ইহার নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা দরকার। রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ত্রুটি দূর করিতে হইলে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও রোড ম্যাপিং। ইহাতে কেহ সেই সকল স্থানে ঘরবাড়ি বা বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করিবেন না এবং সড়ক আঁকাবাঁকা হইবে না বিধায় কমিয়া আসিবে দুর্ঘটনাও।
