গৃহবন্দি দিনগুলিতে

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২০, ২০:২৬

বইপড়া

আঞ্জুমন আরা

 

২০২০ সালের ১৭ মার্চ স্কুলে ছুটি ঘোষণা হলো। বড় ছেলে অস্ট্রেলিয়া থেকে হুকুম দিল—আম্মু-আব্বু যেন ঘরের বাইরে না যায়।

গৃহবন্দি হলাম আমি। নিমেষে গৃহের সমস্ত ক্ষমতা চলে গেল মেজো ছেলে শিশির ও ছোট ছেলে শাকিরের হাতে। শুরু হলো মিলিটারি শাসন। ঘরে থেকেও হাত ধুয়ে ধুয়ে শরীরে বাতের ব্যথা দেখা দিল। ছেলেরা মা-বাবাকে হারাতে চায় না। বই প্রিয় আমার। শিশির প্রায়ই আমাকে বিভিন্ন বই দেয় পড়ার জন্য। কাজের চাপে সব সময় সব বই পড়া হয় না। তবু সে বিভিন্ন বই থেকে বিখ্যাত উক্তি পড়ে শোনায় আমাকে। আমার সাহেব পেপার পড়ে উচ্চস্বরে। আমি শুনি। এতেও কিছুটা পড়ার স্বাদ পাই। শিশির হুমায়ুন আজাদের লেখা ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ বইটি কয়েকবার আমাকে দিয়েছে পড়ার জন্য। কাজের চাপে পড়া হয়নি। লকডাউনের সময় আবার বইটি হাতে দিয়ে বলল, পড়ো।  

এবার পড়লাম।

অভিভূত হলাম বইটি পড়ে। সাধারণ জীবনের কথাগুলো একজন লেখকের হাতে কিভাকে শৈল্পিক রূপ পায় তা এই বইটি না পড়লে বোঝা যায় না। যে শৈশব স্মৃতি আমরা মাঝেমধ্যে হাতড়ে বেড়াই। অব্যক্ত যত কথা মানুষকে ব্যাকুল করে। যা বলা হয় না কখনো। যে দুঃখের স্মৃতি হূদয়ে ওলটপালট হয়ে বারবার ফিরে আসে, এখানে তা লেখা আছে। কত সুন্দর করে লিখেছেন তিনি গ্রামীণ সমাজে বিচরণ করা সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের কথাগুলো। ‘মধুর মতো ভাত’ গল্পে অনাহারী দাগা ও ছিটার অভাবী জীবনে পান্তা ও ফ্যান খাওয়ার দৃশ্যটি যেভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন তাতে আমি অভিভূত না হয়ে পারলাম না। মেলা ও সার্কাস দেখার দৃশ্যটা যেন এখনো চোখের সামনে ভাসে। তার গাঁয়ে ‘বিলের ধারে প্যারিস শহর’ অংশের বর্ণনা মনকে টেনে নিয়ে যায় সেই অজানা বাড়িতে। মনে হয় যেন তাঁর সঙ্গে আমিও ছিলাম ছোট্ট শহরটি ঘুরে দেখার সময়। বইতে লেখা প্রত্যেকটি দৃশ্য আমার চেনা। অথচ সাজিয়ে লিখে প্রকাশ করা হয় না। কাজলা দিদির কথা বলে তিনি যে ভাই হারানোর দুঃখের মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে চোখের জল ফেলতেই হলো। আমিও শৈশবে ডুবে গেলাম।

পরিশেষে, আঞ্চলিক ভাষায় হুমায়ুন আজাদের নিজ গ্রাম ‘রাড়িখাল’কে ডাক পারার বেদনা ও তাঁর গাঁয়ের প্রতি হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসার ব্যাকুলতা যে কোনো পাঠকের মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। এক কথায় ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’  অতুলনীয়। বইটি সবার পড়া উচিত।