একটি বিপ্লব নীরবে ঘটিয়া চলিতেছে সারা বিশ্বে। করোনা আসিয়া উহাকে আরো বেগবান করিয়াছে। উহা হইল ডিজিটাল বিপ্লব, যাহাকে চতুর্থ বিপ্লবও বলা হইয়া থাকে। কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংক ‘ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে ডিজিটাল বিপ্লব সম্পর্কে একটি ছোট্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সেইখানে বলা হইয়াছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী প্রায় ২১ হাজার কোটি ইমেইল পাঠানো হয় এবং গুগলে ৪৫০ কোটি বার বিভিন্ন বিষয় খোঁজা হয়! এক যুগ পূর্বেও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনগুলি কিন্তু অকল্পনীয় ছিল। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, আগামী ১০ বত্সরে মধ্যে ডিজিটাল বিপ্লবের এমন সকল পরিবর্তন দৃশ্যমান হইবে—যাহা ইহার আগে কখনোই সম্ভব হয় নাই। করোনার পরিস্থিতি এই বিপ্লবে পালে নূতন হাওয়া লাগাইয়াছে। আর তাহার চিত্র প্রকাশ পাইয়াছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনেও। সেই প্রতিবেদনে বর্তমান বিশ্বের জন্য এই ভার্চুয়াল বাস্তবতার আরেকটি চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছে। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ডিজিটাল সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় বাধা হইল ডিজিটাল শিক্ষা। নিম্ন আয়ের দেশগুলির ক্ষেত্রে মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষের ন্যূনতম ডিজিটাল শিক্ষা রহিয়াছে। অর্থাত্ মেইল পাঠানো, ইউটিউবে ভিডিও দেখা এই ধরনের সাধারণ শিক্ষা। এমনকি উচ্চ আয়ের দেশে এই হার ৬২ শতাংশ, আর মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষা রহিয়াছে মাত্র ৪৪ শতাংশ মানুষের।
সমগ্র বিশ্ব দেখিতেছে, করোনার এই মহামারির সময় কীভাবে কাজ হারাইতেছে মানুষ। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, বিশ্বখ্যাত সংস্থা মাইক্রোসফট ধারণা করিতেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে নূতন ডিজিটাল দক্ষতার চাহিদা আগের চাইতে বহু গুণ বৃদ্ধি পাইবে। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি, করোনা মহামারিকে প্রতিহত করিতে বিশ্বব্যাপী যেই আগ্রাসি লকডাউন চলিয়াছে, তাহাতে ডিজিটালাইজেশন আরো ত্বরান্বিত হইয়াছে। মাত্র পাঁচ বত্সরের মধ্যে গতানুগতিক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলি হ্রাস পাইবে। তাহার পরিবর্তে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন নূতন চাকরির উদ্ভব হইবে। এবং ইহাও আশঙ্কা করা হইতেছে যে, ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে বিশ্বের দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরো জটিল হইতে পারে। কারণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মানুষের অনেক কাজ রোবট ও যন্ত্রপাতি দিয়াই পরিচালনা করা হইবে। ফলে নূতন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও তাহা সমস্যা তৈরি করিবে।
এই বাস্তবতায় আমরা কোথায় রহিয়াছি? আমরা কি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে চতুর্থ বিপ্লবের জন্য উপযুক্ত কারিকুলামে ও শিক্ষায় তৈরি করিতে পারিতেছি? বর্তমানে আমাদের দেশে স্নাতক পর্যায়ে পড়িতেছেন মোটামুটি ৩৫ লক্ষাধিক ছেলেমেয়ে। তাহারা যেই উচ্চশিক্ষা লইতেছেন সেই শিক্ষা কীভাবে কাজে লাগাইবে দেশ—কোন খাতে লাগাইবে, ছেলেমেয়েরা কীসে দক্ষ হইতেছে—তাহা কি ভাবিয়া দেখা হইতেছে? আমাদের যেই শিক্ষা, সেই শিক্ষা কম প্রয়োজনীয় বিষয়ে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্ম দিতেছে। এই শিক্ষা কি ডিজিটাল শিল্পবিপ্লব মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত? সুতরাং সময় ক্ষেপণ না করিয়া আমাদের নিজেদের নূতন করিয়া সাজাইতে হইবে। নইলে আমরা নিশ্চিতভাবেই পিছাইয়া পড়িব।
