লেবাননে হঠাত্ অশান্তি

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২০, ২১:৪৭

ইতিহাসের এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর দেশ লেবানন। লেভান্ট অঞ্চলভুক্ত ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলীয় দেশ লেবাননের বৈরুত সমুদ্রবন্দরের সাম্প্রতিক বিক্ষিপ্ত বিস্ফোরণ সেদেশের জনগণকে হঠাত্ কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর বৈরুতের সর্বশেষ পরিস্থিতি দেশটির জন্য অবর্ণনীয় ক্ষতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। মূলত বৈরুত বন্দরভিত্তিক এই বিস্ফোরণ স্থানীয় জনজীবনকে প্রায় স্থবির করে তুলেছে। এই ঘটনায় অবকাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি ছাড়াও ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশটি। গত ৪ আগস্ট বৈরুত বন্দরের বিস্ফোরণ-উত্তর সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় লেবাননের জনগণ ও সরকার কার্যত দিশেহারা। যদিও এই পরিপ্রেক্ষিতেই হঠাত্ উত্তাল হয়ে পড়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ইতিমধ্যে কিছু পশ্চিমাপন্থি লেবানিজ বিস্ফোরণের ঘটনায় দেশের রাজনীতিকদের দায়ী করে বিক্ষোভ শুরু করেছেন রাজধানী শহরে। এক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা উপেক্ষা করে পশিমাপন্থিদের বিক্ষোভ গত দুই দিনে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। যদিও দেশটির প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন, প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব, লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ সামরিক পরিষদ, সেনাবাহিনী এবং লেবাননের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিজবুল্লাহ চলমান দুর্যোগ মোকাবিলায় জনগণকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিস্ফোরণের সত্যিকার কারণ অনুসন্ধান করে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা। এই লক্ষ্যে দেশটির নেতৃত্ব অনেকগুলো প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এতত্সত্ত্বেও সেখানে বিস্ফোরণ-পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলার লক্ষ্যে জারিকৃত জরুরি আইন উপেক্ষা করে সরকারবিরোধী সহিংস বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সম্ভবত এই ধরনের পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেই প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন বিস্ফোরণের পরপরই এক নির্বাহী আদেশে পরবর্তী ১৫ দিনের জন্য লেবাননে জরুরি আইন জারি করেছিলেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়ে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রশমনের অগ্রিম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু অব্যাহত সহিংস বিক্ষোভের মুখে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে লেবানন সরকার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে। এর মধ্য দিয়ে লেবাননে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সক্রিয়তা বেড়ে যেতে পারে। বৈরুতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিশ্বশক্তিগুলোর মতপার্থক্যের ব্যপারটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। যে কারণে চলমান দুর্যোগ মোকাবিলার চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারটি মুখ্য হয়ে ওঠে কি না সেটি ভাবতে হচ্ছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সামরিক সমীকরণে লেবাননের অবস্থান পশ্চিমা অক্ষের বিপরীতে। একই সঙ্গে দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত আছেন দীর্ঘকাল থেকে। অন্যদিকে লেবাননের রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের লড়াই সবারই জানা। এই ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বিস্ফোরণের ঠিক পরেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের বৈরুত সফর। অন্যদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় কিছু লেবানিজ কর্তৃক নিজ নেতাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার একই সঙ্গে ম্যাক্রনের কাছে নালিশ করার প্রক্রিয়াগুলো লেবাননের রাজনীতিকদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর। এই সূত্র ধরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট লেবানিজ প্রেসিডেন্ট মিশেল আউনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধান করতে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানান। যদিও আউন তাত্ক্ষণিকভাবে ফরাসি প্রেসিডেন্টের দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন ম্যাক্রনের বৈরুত সফর শেষ হওয়ার ঠিক পরের দিন আলাদা একটি বিবৃতি দিয়েছেন। ঐ বিবৃতিতে লেবাননে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ছায়া ফিরে আসার সব শঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন। পাশাপাশি ঔপনিবেশিকতাবাদের কড়া সমালোচনা করে লেবানিজদের সতর্ক থাকতে বলেছেন। উল্লেখ্য, লেবানন একসময় ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। অন্যদিকে সম্প্রতি কতিপয় লেবানিজ লেবাননে আবার ফ্রান্সের শাসন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন। মূলত এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে লেবাননে ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকা পশ্চিমাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এককাট্টাই আছেন। তাদের সঙ্গে আছেন দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনী। যে কারণে দুর্যোগ যত কঠিনই হোক, তা মোকাবিলার প্রয়োজনীয় সাহস ও সক্ষমতা লেবানিজদের আছে বলেই ধরে নেওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি এই বিপর্যয় সামলে নিতে বৈরুত নিজ মিত্রদের কাছ থেকেও উপযুক্ত সহযোগিতা পাবেন। ইতিমধ্যে লেবাননের দুর্গত মানুষদের জন্য ইরান, রাশিয়া, সিরিয়াসহ অনেক দেশই বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসাহায্য পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মানবিক ত্রাণ নিয়ে লেবাননে গেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কার্গো বিমান সি-১৩০। এ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে লেবানন ঘিরে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর ভূমিকা ও বিস্ফোরণের কারণ। বৈরুত বন্দরে মজুতকৃত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটই বিস্ফোরণের উত্স বলে প্রাথমিকভাবে সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম এ ধরনের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। উল্লেখ্য, প্রায় ছয় বছর আগে ইউরো জোটে যোগ দিতে প্রবল আগ্রহী সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র জর্জিয়ার একটি জাহাজ থেকে এই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট জব্দ করেছিল বৈরুত বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের বিস্ফোরক পদার্থ কেন এতদিন ধরে বন্দরে অরক্ষিত অবস্থায় ছিল, সেটি কারোরই বোধগম্য নয়। সম্ভবত এই সত্য উদ্ঘাটনের জন্য শুরুতেই বন্দরের শীর্ষস্থানীয় কর্তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। সর্বশেষ বৈরুত বন্দরের ১৬ জন কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। তবে লেবানন কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি আছে কি না, সেটি জানতে তদন্ত রিপোর্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয়। কিন্তু লেবাননের নিজস্ব তদন্তের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট কার্যত একটি সংশয়ের অবতারণা করেছেন। এই সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে ফ্রান্স কিংবা অন্যান্য পশ্চিমা দেশ লেবানিজ তদন্ত প্রতিবেদন মেনে নেবে কি না। এক্ষেত্রে পশ্চিমারা লেবানিজ তদন্তের ওপর আস্থা না রাখলে লেবানন ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ঘোলাটে হবে। এই সূত্র ধরে লেবাননের  অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অবনতি ঘটার প্রবল আশঙ্কা থাকবে। এক্ষেত্রে দেশটির জাতীয় ঐক্য-সংহতি জোরদার রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে লেবানিজদের। এছাড়া বন্দর অবকাঠামোর ক্ষতিজনিত আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কঠিন পথ অতিক্রম করতে হবে দেশটিকে।

সব মিলিয়ে লেবানন মারাত্মক ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম ধাপেই থাকছে খোলা মনে আন্তর্জাতিক সাহায্য। কিন্তু লেবাননের রাজনৈতিক ইতিহাস, আঞ্চলিক সমীকরণ ছাড়াও বিভিন্ন মানদণ্ডে বৈরুত পশ্চিমাদের কাছ থেকে নিঃশর্ত সাহায্য পাবে বলে মনে হচ্ছে না। ইতিমধ্যে লেবানন কর্তৃপক্ষকে বাদ দিয়ে দুর্গত এলাকায় সাহায্য-সহযোগিতা করার দাবি উঠেছে। অনেকটা সিরিয়ার মতো সরকারের অনুমোদন ছাড়া বিভিন্ন অনুগত গোষ্ঠীর মাধ্যমে লেবাননেও মানবিক সাহায্য বিতরণের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। পাশাপাশি এই সংকটজনক মুহূর্তে লেবাননে বিভিন্ন সংস্কারের দাবি উঠছে, কিন্তু দেশটির পক্ষে পশ্চিমাদের চাহিদামতো সংস্কার অসম্ভব—এ কথা প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন খুব স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছেন। তাই এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে লেবাননের মনোমালিন্য দরকষাকষিতে রূপ নিতে পারে। এর ফলে সাম্প্রতিক কালে আঞ্চলিক সমীকরণে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা লেবাননের সক্ষমতা কমে আসতে পারে।

বৈরুত বন্দর বিস্ফোরণ-পরবর্তী লেবাননের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হবে বলে মনে হচ্ছে না। এই সূত্র ধরে লেবাননের পশ্চিমা রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দুর্বল করতে বিভিন্ন ম্যাকানিজম চলবে, যা গত কয়েক বছর ধরেই অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সেখানে একধরনের রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে, যারা কথায় কথায় সরকারের পতন চেয়ে বিক্ষোভ-সহিংসতা শুরু করে। কিন্তু লেবাননের সরকার পতন কিংবা নতুন সরকার গঠন স্থানীয় পরিস্থতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে না। কেননা, লেবাননের রাষ্ট্রীয় শক্তির মূল উপাদান আছে অন্যত্র। ঐ মৌলিক শক্তির আলোকেই লেবানন পরিচালিত হয়ে থাকে। এই ধারার পরিবর্তন চাইলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। কিন্তু তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দুটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ সামরিক পরিষদ ও লেবানিজ আর্মি ছাড়া সেখানে কোনো ধরনের সংস্কার সম্ভব নয়। অন্যদিকে লেবাননের সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ রাষ্ট্রীয় চেতনার এই জায়গায় আস্থাশীল। তাই বিস্ফোরণ-পরবর্তী পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, লেবানিজরা সেটি সামলে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি কী হবে সেটি পূর্ণাজ্ঞ তদন্ত প্রতিবেদনের পরই অনুমান করা যাবে।

n লেখক :আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক