সিসার বিষক্রিয়া ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২০, ২১:৩৪

সম্প্রতি ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ প্রকাশিত এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বাংলাদেশের আনুমানিক ৩ কোটি ৫৫ লক্ষ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা পাঁচ মাইক্রোগ্রাম বা ডেসিলিটারের অধিক। শুধু বাংলাদেশ নহে, সমগ্র বিশ্বেই শিশুরা অধিক মাত্রায় সিসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হইতেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা শোচনীয়। সমগ্র বিশ্বে প্রতি তিন শিশুর এক জন তথা প্রায় ৮০ কোটি শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে। ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিক্স ইভালুয়েশনের মতে, সিসার বিষক্রিয়ায় যেই সকল দেশে মৃত্যুর হার সবচাইতে অধিক, সেই সকল দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আরো উদ্বেগজনক খবর হইল—এই দেশের জনসংখ্যার প্রত্যেকের রক্তে সিসার উপস্থিতির গড় হার ৬ দশমিক ৮৩ মাইক্রোগ্রাম। ইহা সর্বোচ্চ হারের দিক হইতে বিশ্বে ১১তম।

বাংলাদেশের শিশু ও সার্বিকভাবে জনগণের রক্তে সিসার মাত্রা ক্রমান্বয়ে কেন বাড়িতেছে? ইহার মূল কারণ, আমাদের দেশে এখনো শিশুশ্রম বজায় রহিয়াছে। গরিব ও নিম্নবিত্ত ঘরের শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন কলকারখানায় কাজ করিয়া থাকে। ব্যাটারি কারখানায় কাজ করিয়া থাকে অনেক শিশু। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়িয়া গিয়াছে। ইহাতে বাড়িয়াছে সিসা ফ্যাক্টরির বিস্তার। এইখানে ইজিবাইকে ব্যবহূত পরিত্যক্ত ব্যাটারি সংগ্রহ করিয়া সিসার পাতগুলি বাহির করিয়া আলাদা করা হয়। পরে পাতগুলি উচ্চ তাপমাত্রায় গলাইয়া সিসা ও লোহা পৃথক করা হয়। পরবর্তী সময়ে ঐ সিসা আবারও ব্যাটারি তৈরির কাজে ব্যবহূত হয়। শুধু তাহাই নহে, বিভিন্ন জেলার অনেক ইটভাটায়ও জ্বালানো হইতেছে এই সিসা। এই সকল ফ্যাক্টরি হইতে নির্গত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশ, মানুষ ও পশু স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলিতেছে। শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও শ্বাসকষ্ট ও হূদেরাগে আক্রান্ত হইতেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে আশপাশের কৃষিজমি। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ও কীটনাশক শাকসবজি ও বিভিন্ন ফসল উত্পাদনে ব্যবহারের কারণে খাদ্যেও সিসার মাত্রা বৃদ্ধি পাইতেছে আশঙ্কাজনকভাবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) চাউলে সিসার উপস্থিতি পাইয়াছে। হলুদসহ বিভিন্ন মসলায় পাওয়া গিয়াছে উচ্চমাত্রার সিসা। এই সকলের প্রকোপে দেশে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িতেছে। বর্তমান বাজারে চর্ব্য-চূষ্য-লেহ্য হেন উপাদান পাওয়া কঠিন, যেইখানে ভেজাল ও বিষাক্ত পদার্থ নাই। ইহা ক্যানসার, কিডনি ও ফুসফুসের রোগসহ নানা স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় তৈরি করিতেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ও বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মও হইতেছে।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে ইহাও বলা হইয়াছে, সিসার ভূমিকার কারণে বাংলাদেশে আইকিউ হ্রাস পাওয়ায় যে অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধিত হইতেছে, তাহা দেশের জিডিপির ৫ দশমিক ৯ শতাংশের সমান। সিসার বিষক্রিয়া শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করিতেছে। শিশুরা কিডনি ছাড়াও কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হইতেছে। এই জন্য সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারিগুলির অনানুষ্ঠানিক ও নিম্নমানের পুনর্ব্যবহার বন্ধ করিতে হইবে। শিশু ও তাহাদের অভিভাবকদের এই ব্যাপারে সচেতন করিতে হইবে। সর্বোপরি ক্ষতিকর হাইব্রিড ও জেনেটিক্যালি মডিফাইড খাদ্যের প্রচলন হ্রাস করিতে হইবে। কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার যথাসম্ভব কমাইয়া আনিতে হইবে।