স্মার্টফোন ব্যবহার করেন আর টিকটকের ভিডিও দেখেননি এমন কাউকে পাওয়া বেশ কঠিনই হবে বর্তমান সময়ে। অথবা বহুলব্যবহূত কলিং অ্যাপস ইমু ব্যবহার করেন অথচ লাইকি থেকে বিচিত্র রকমের প্রেম নিবেদনকারী নোটিফিকেশান পাননি এমন মানুষও খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্করই হবে নিশ্চয়। সিনেমা নাটকের জনপ্রিয় সংলাপ , গান বা ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের বক্তব্যের একাংশের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে ও হাত-পা নাড়িয়ে ভিডিও তৈরির অ্যাপস টিকটক ও লাইকির ব্যবহার দিনদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এই অ্যাপসগুলোর মাধ্যমে যেসব অশ্লীল ভঙ্গিমায় দেহ প্রদর্শন, ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও নির্মাণ ও বিকলাঙ্গ মানসিকতা প্রচার ও প্রসারের মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে তা যে কোনো রুচিশীল ও বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের সহজেই বোধগম্য হবে মনে করি। সেলিব্রিটি তারকা থেকে শুরু করে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরী কেউই পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রে। ইদানীংকালে বৃদ্ধ বয়সি কিছু মানুষজনের আগ্রহও বেশ চমকে উঠার মতো।
সম্প্র্রতি চীনের বাইটডান্স নির্মিত ‘টিকটক’ ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংস্থা বিগোর ‘লাইকি’ অত্যন্ত অল্প সময়ে বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে এশিয়ায় কিশোর-কিশোরীদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা প্রযুক্তি বাজারে ও ১৭ সাল নাগাদ বিশ্ব বাজারে টিকটক এবং ২০১৭ সালে লাইকি উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই হু হু করে বাড়তে থাকে সামাজিক মাধ্যম দুইটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা। বর্তমানে টিকটক এবং লাইকি এশিয়ায় নেতৃত্বস্থানীয় দুইটি ছোট ভিডিওর প্ল্যাটফরম এবং সব থেকে বড় সংগীত ভিডিওভিত্তিক দ্রুততম ক্রমবর্ধমান সামাজিক নেটওয়ার্ক ও প্ল্যাটফরম। গ্লোবাল ওয়েব ইন্ডেক্সের তথ্যানুসারে বর্তমানে টিকটক ও লাইকি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ব্যবহারকারীর সংখ্যায় শীর্ষে থাকা ভারতে চলতি বছরের ৩ এপ্রিল দেশটির আদালত কর্তৃক টিকটক নিষিদ্ধ করার জন্য কেন্দ্রকে নির্দেশ দেওয়ার পর বাংলাদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সচেতন নাগরিকগণ এদেশেও এটি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন। যদিও এখন অব্দি মাধ্যম দুইটি নিয়ন্ত্রণের আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি।
গত ০৩ আগস্ট সাধারণ মানুষকে হেনস্থা, মারধরের অভিযোগে কথিত টিকটক স্টার অপুকে সহযোগীসহ গ্রেফতারের পর ফের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে আলোচনা-সমালোচনার পাতায় জায়গা করে নিয়েছে টিকটক-লাইকির নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ও ব্যবহারকারীদের রুচি বিবর্জিত তথাকথিত ট্রেন্ড। এদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হওয়া থেকে বাদ পড়ছে না সমাজের সম্মানী পেশাজীবী মানুষ জনও। গত ৩ আগস্ট অপু ও তার কথিত বাহিনীর হাতে হামলার শিকারের পর ইঞ্জিনিয়ার মো. হাসিবুল হক নামের একজন ব্যক্তির ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আবারও প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠে। অবশেষে ৪ আগস্ট আদালত অপু ও তার সহযোগীর জামিন নামঞ্জুর করে দুই জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
নিছক বিনোদন ও অল্প সময়ে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা থেকে এসব সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখা গেলেও ইদানীংকালে অল্প কিছু পয়সা আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কিশোর-কিশোরীদের আগ্রহে নতুনমাত্রা যোগ হয়েছে। বিচিত্র প্রাণীদের মতো হেয়ারস্টাইল আর কিম্ভূতকিমাকার বেশভূষা ধারণ করে ভিডিও ধারণের পর তা শুধু মাধ্যম দুইটিতে আপলোড দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না তারা বরং সেগুলোকে বাস্তব জীবনের অনুষঙ্গ বানিয়ে হাজার তরুণদের তথাকথিত হিরো/মডেল বনে গিয়ে ফিল্মি কায়দা-কসরত দেখানোর নামে তৈরি করছে কিশোর গ্যাং। তারপর সেখান থেকে শুরু দাদাগিরি। আজব নাচ আর বিদেশি ভাষার জনপ্রিয় গান ছাড়াও যে প্রতিভা প্রদর্শনের সুস্থ-স্বাভাবিক-সৃজনশীল পন্থা আছে তা যেন মাধ্যম দুইটির ব্যবহারকারীদের কোনো শ্রেণিরই জানা নেই।
নৈতিকতা, সামাজিকতা, শ্লীলতা কিংবা মানবিক মূল্যবোধের মতো অত্যাবশ্যকীয় সামাজিক গুণাবলির সংকটে পড়া তরুণ প্রজন্মের এই বিশাল অঙ্কটা পুরো জাতির মানসিক পরিপক্বতার বিপরীতে ক্রমবর্ধমান ক্যানসার হিসেবেই আবির্ভূত হতে যাচ্ছে । সেই সঙ্গে এখান থেকে গজিয়ে ওঠা কিশোর গ্যাংরা আগামীর বাংলাদেশে জনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে ওঠাকে ক্রমশই ত্বরান্বিত করছে। প্রযুক্তি নির্ভর একুশ শতকের তরুণ প্রজন্মকে সুপথে রাখা না গেলে হয়তো সোনার বাংলার আকাশ অদূর ভবিষ্যতে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে। সেই ধোঁয়ার বিষাক্ততায় বাঁচব না আমি , আপনি, আমরা কেউই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
