অনলাইন ক্লাসের বিড়ম্বনা

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২০, ২১:৩৬

 ‘অনলাইন ক্লাসের জন্য একমাত্র সম্বল হালের গরু বেঁচে ছেলেকে মোবাইল কিনে দিল অসহায় বাবা’—এটা আমার কথা নয়, এই তো কিছু দিন আগেই একটি স্বনামধন্য পত্রিকায় খবরটি প্রকাশ পেল, এমন খবর প্রতিদিন নতুনভাবে, নতুন করে প্রকাশ পাচ্ছে। মহামারি করোনায় পুরো পৃথিবী আজ বিপর্যস্ত, এই মহামারি থেকে রক্ষা পায়নি বাংলাদেশ। সুন্দর ছোট্ট দেশটা নিমিষেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়ে গেল। প্রতিদিন গড়ে দেশে প্রায় ৪০ জনের বেশি মানুষ করোনায় মারা যাচ্ছে। দেখা দিয়েছে বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা ও অর্থনৈতিক মন্দা। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে সেই সঙ্গে চরম আঘাত হানে বেকারত্ব। যদিও করোনাকালীন সময়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাকার্যক্রম নিয়মিত করার জন্য ও সেশনজট নিরসনের জন্য অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম চালু করেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা দেশের নানা প্রান্ত থেকে অবস্থান করে, এ অবস্থায় অনলাইন কার্যক্রমের উদ্দেশ্য কার্যকর হবে বলে মনে হয় না।

অনলাইন ক্লাসের জন্য প্রয়োজন উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট কানেকশনসহ ভালোমানের মোবাইল অথবা কম্পিউটার। যেখানে বেকারত্ব থেকে মুক্তির জন্য অসহায় মানুষ গ্রামে ছুটছে কিছু কাজের আশায় এমন পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক অনলাইন ক্লাসের জন্য শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ফেলছে এমন পরিবারের সংখ্যা কম নয়। যদিও গুটিকয়েক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে কিন্তু তাও নগণ্য। কিন্তু আশাহত ব্যাপার হলো এমতাবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা নিয়ে সেশনজট এড়াতে চাইছে। অপর দিকে অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শুধু হতাশা নয় একই সঙ্গে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি রয়েছে। করোনা-বন্যা এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে বেঁচে থাকাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে শিক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ভাবার বিষয়। যারা শহরে চার দেয়ালের মধ্যে অবস্থান করছে তারা হয়তো ক্লাসে অংশগ্রহণ করলেও মফস্বল ও গ্রামের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এক দিকে বেঁচে থাকার লড়াই, বেকারত্বের অভিশাপ অন্য দিকে অনলাইন ক্লাসে বিড়ম্বনা। এতে শিক্ষার্থীরা মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে।

এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, বেঁচে থাকার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন নাকি শিক্ষার জন্য বেঁচে থাকা? যদি বেঁচে থেকে জীবনমান উন্নয়ন করার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন হয়, তবে সেই শিক্ষার প্রয়োজন কতটুকু যেই শিক্ষার জন্য নিজের বেঁচে থাকার শেষ সম্বল বিলিয়ে দিতে হয়? মানুষের মৌলিক চাহিদাতে সর্বপ্রথম খাদ্যের স্থানে শিক্ষাকে জায়গা দিতে হবে বলে এজন্যই কি অনলাইন কার্যক্রমের আয়োজন? অনলাইন ক্লাসের উদ্দেশ্য যদি সেশনজট দূরীকরণ ও সার্টিফিকেট অর্জন হয়ে থাকে তবে সেই উদ্দেশ্য সফল হলেও শিক্ষার্জনের মূল লক্ষ্য কখনোই সাধিত হবে না। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার্জনের মূল লক্ষ্য শুধু সার্টিফিকেট অর্জন নয়। যার ফলে হতাশা, মেন্টাল সিকনেস, স্ট্রেস এসবের জন্ম নিচ্ছে বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে। অনলাইন ক্লাস দেশকে হতাশাগ্রস্ত তরুণ সমাজ উপহার দিতে পারবে যা দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যে দেশে দুমুঠো খাবারের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করতে হয় সে দেশে অনলাইন ক্লাস স্রেফ বিলাসিতা। যে প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ দেশের ও মানুষের ক্ষতিসাধন করে তা থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়