বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জরুরি অবস্থার মধ্যে মোংলার পুরাতন বন্দর এলাকায় (শহর) সরকারি খাস জমি (চর ল্যান্ড) মনে করে বন্দর কর্তৃপক্ষের ইজারা দেওয়া দেড় শতাধিক প্লট উপজেলা প্রশাসন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ উচ্ছেদ করে। পরে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সরেজমিন পরিমাপে উচ্ছেদ করা ঐ প্লটের জায়গা বন্দরের নিজস্ব অধিগ্রহণকৃত জমির মধ্যে রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। এর পর বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে উচ্ছেদকৃত জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে পুনর্বাসনের সরকারি নির্দেশনা দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে প্লটের মালিক ও ব্যবসায়ীরা এখনো অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আটক রয়েছেন । দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পার হলেও ব্যবসায়ীরা এখনো ফিরে পাননি তাদের নির্ধারিত প্লট। ফলে ব্যবসার পুঁজিসহ সহায়সম্বল হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে এসব ব্যবসায়ীর। আর পাঁচ বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের পুনর্বাসন সংক্রান্ত নির্দেশনা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থায় ব্যবসায় পরিচালনা করতে না পারায় অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এসব ব্যবসায়ী এখন হতাশার মধ্যে রয়েছেন। কবে নাগাদ ব্যাবসায়িক প্লট ফিরে পাবেন, তা-ও জানা নেই তাদের।
মোংলা পৌর শহরের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানান, পুরাতন মোংলার রিজেকশনগলি, ফেরিঘাট, মামারঘাট, বেঙ্গলওয়াটার জেটি ২ নম্বর জেটি, ১ নম্বর জেটিসংলগ্ন এলাকায় মোংলা বন্দরের নিয়মনীতি অনুযায়ী ১৫২টি প্লট বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায় চালিয়ে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থায় সরকারি খাস জমির অধীনে থাকার অজুহাতে একটি প্রভাবশালী মহলের ইশারায় পুরাতন বন্দর ও পৌর শহরে ব্যবসায়ীদের ১৫২টি বৈধ প্লট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা ২০০৯ সালে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করেন। এর পর ২০১৪ সালে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সরেজমিন পরিমাপে উচ্ছেদ করা ঐ প্লটের জায়গা বন্দরের নিজস্ব অধীগ্রহণকৃত জমির মধ্যে রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। এ নিয়ে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে ব্যবসায়ীদের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সচিব নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ পাঁচ বছরেও বাস্তবায়ন করেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর এ কারণে ব্যবসায়ীরাও ফিরে পাননি তাদের প্লট। এ অবস্থায় ২০১৮ সালের ৭ জুন মোংলা বন্দর বণিক সমিতির পক্ষ থেকে প্লট বুঝে পেতে আবার বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়। এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আলী আহম্মদ, আ. গনি বড় মিয়া, সাহেব আলী মল্লিকসহ অনেকেই জানান, ব্যবসায়ীরা তাদের প্লটগুলো হারিয়ে পথে বসেছেন । এতে মোংলা বন্দরের ব্যবসাবাণিজ্যে যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি বন্দর হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালের ৪ মে প্লটের মালিক ও ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনসংক্রান্ত সভায় এক মাসের মধ্যে বরাদ্দকৃত প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এদিকে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও তাদের নির্ধারিত প্লটে অবৈধভাবে অনেকে আস্তানা গড়ে তুলছে। এ বিষয়ে প্লট মালিকেরা মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিলেও মিলছে না স্থায়ী কোনো সমাধান। এদিকে উচ্ছেদকৃত জায়গা কেউ কেউ অবৈধ দখলে নেওয়ায় উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া এবং এই মামলা নিয়ে তেমন জটিলতা নেই বলে জানান ব্যবসায়ী নেতারা। ব্যবসায়ীরা বলেন, প্লট পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট সভায় মামলা প্রত্যাহার করার লিখিত অঙ্গীকার করা হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ কৌশলে তা মানতে চাইছে না। ব্যবসায়ী নেতাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহলের কিছু নেতা ও অসাধু কর্মকর্তাদের ইন্ধনে বন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদকৃত প্লট মালিকদের জায়গার বরাদ্দপত্র বাতিল করে নামে-বেনামে নেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন। মামলা একটি অজুহাতমাত্র।
এ বিষয় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, জরুরি অবস্থায় ভেঙে দেওয়া ব্যবসায়ীদের নিজ নিজ প্লট তাদের বুঝিয়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষের রয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে মামলা থাকায় এ বিষয় এখনই কোনো সমাধান করা সম্ভব নয়।
