অণুগল্প

লিফটের পাঁচ

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২০, ২১:১৬

আমার পরিবারের একটা বাড়তি অংশ ঢাকায় ফেলে এসেছিলাম। আজ ২২ দিন পর দেখা হলো। ইম্পেরিয়াল মেহরিন নূরজাহান ফ্ল্যাটে আমরা গত দশ-বারো বছর নিকট প্রতিবেশী হিসেবে একসঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করেছি।

ঢাকার ফ্ল্যাটজীবন নাকি যার যার তার তার। কারো সঙ্গে কারো সংযোগ নেই, লিফটে দেখা হলে মাপা হাসি বিনিময়।—কেমন আছেন, ভালো তো? দেখুন তো লিফট ঠিকমতো চলছে না। কমিটির লোকজন যে কী করে! জেনারেটর বিকল, কারো নজর নেই। গ্যারেজ ময়লায় ডুবে আছে, ক্লিনারটা চরম ফাঁকিবাজ। দারোয়ানগুলো চরম বেয়াদব, একটা সালাম দিলে কী তাদের অসুবিধা! ওদের প্রপার ট্রেনিং না দিয়ে কমিটি কেন যে চাকরি দিল? বুঝলেন, অমুক সাহেব তো গাড়ি কিনল। তার মেজাজে টিকতেই পারি না। লিফটের পাঁচের কী যে অবস্থা। এক দঙ্গল ছেলেপুলের চিত্কার-চেঁচামেচিতে দুপুরে একটু ঘুমাতেও পারি না। নাঃ, এসব আর সহ্য করার মতো নয়। সামনের মিটিংয়ে করিডোরে বাচ্চাদের খেলা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। ওমুক ফ্ল্যাটের তমুক সাহেব গার্ডদের দিয়ে পার্সনাল কাজ করায়, এগুলো কি ঠিক! বলুন তো? কী যে একটা অবস্থা। ছাদে তো যাওয়ার উপায় নেই। পাশের নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের ময়লা পড়ে ছাদটাকে নষ্ট করে দিল। একটু হাঁটব, তারও উপায় নেই। আপনি তো ভাগ্যবান। ছেলে জার্মানি গেছে। ওমুকের ছেলেটা তো কর্পোরেট চাকরি পেয়েছে। বাবা, ওমুক ভাই খুবই ভাগ্যবান, কী বলেন! চারতলার অবস্থা জানেন? খবর রাখেন কিছু? জামাই-বউ ঝগড়া করে পুরো বিল্ডিংটাকে কাঁপিয়ে দিল। লজ্জা, লজ্জা। আমরা কি বস্তিতে থাকি, হ্যাঁ, বলুন, বলুন। নাহ, আর পারি না, ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে যাব। আমাদের আর মান-সম্মান রইল না।

সহজভাবে বলতে গেলে ঢাকার ফ্ল্যাটজীবন এরকমই। সকালে আলো ফোটার আগে ছোটদের সঙ্গে মা-বাবার স্কুল নিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ দিয়ে দিনের শুরু। তার কোনো শেষ নেই। কবুতরের জীবন। বাসা, লিফট, রিকশা, বাস, গাড়ি, উবার, সিএনজি, সড়কের যানজট, আবার ঘামতে ঘামতে ঘরে ফিরে ছোট্ট ঘরে টিভি দেখা। এটাই ঢাকা জীবনের নিয়তি। কোনো ফাঁক নেই, অবসর নেই। যেন যন্ত্রের জীবন।

আজ আমার ফ্ল্যাটে বেড়াতে গেলাম। আমরা তো লিফটের পাঁচে থাকি। সবচেয়ে হৈচৈ গ্যাঞ্জাম ফ্লোর। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খবরটা চাউর হয়ে গেল। নানাভাই এসেছে। মনে করেছিলাম এক কাপ চা খেয়ে আসব। ওরে বাবা, পাঁচ নম্বর ফ্লোর তো অন্যরকম। তাদের ভালোবাসা ঢাকার মতো যান্ত্রিক নয়। যাদের নাতি বলে জেনেছি, মেয়েদের মতো করে ভেবেছি, জামাইদের ছেলের মতো করে ভেবেছি—তারা তো আসলে আমাদের জীবনে মেয়ের মতো নয়, আসলেই মেয়ে, জামাইরা ছেলে আর নাতি-নাতনিরা আমার নিজের মেয়ের ঘরেরই ছেলেমেয়ে।

আজ ইম্পেরিয়াল বিল্ডিংয়ে আমাদের নিয়ে পারিবারিক মিলনমেলা হয়ে গেল। আইরিনের আব্বু প্রায় কান্না কান্না স্বরে বলল, আংকেল, আপনারা বাসাটা ভাড়া দিয়ে চলে গেলেন, আমরা এতিম হয়ে গেছি। বাচ্চারা আর করিডোরে বের হয় না। সবাই যার যার ঘরে বসে থাকে।

চা এলো, মিষ্টি আর ফলের মহাসমারোহ। বাড়িতে যেন ঈদ লেগেছে। ছোট্ট আবদুল্লাহ নাচতে লেগে গেল, অরিক নানাভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল, তোমাকে যেতে দেব না। রোজা কানের কাছে এসে বলল, যাইয়ো না নানাভাই। এই রুমটায় তোমরা থাকো।

রোজার আব্বা-আম্মা একেবারে সোজাসাপটাভাবে বলেই দিলেন, আংকেল এটাই আপনার বাড়ি, কেন অন্য কোথাও থাকবেন?

অরিকের মা বলল, আংকেল আমার একটা রুম তো খালিই পড়ে থাকে। আপনারা আমার বাসায় থাকবেন।

আমি অবাক হয়ে যাই।

লিফটের পাঁচ এখন বদলে গেছে।

ঢাকার জীবনের সঙ্গে ফ্লোর নম্বর পাঁচের কোনো মিল খুঁজে পাই না।

জীবন সত্যি অনেক সুন্দর।