দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের নিরাপত্তার জন্য মুজিব কিল্লা নির্মাণ করা হয়েছিল। সংস্কারের অভাবে আর অযত্ন-অবহেলায় দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত এসব মুজিব কিল্লা। বঙ্গবন্ধুর সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকে ‘মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প’ গৃহীত হয়। পরিত্যক্ত মুজিব কিল্লা সংস্কারের পাশাপাশি নতুন করে আরো মুজিব কিল্লা নির্মাণের লক্ষ্যে নেওয়া হয় প্রকল্পটি। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরু হয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। সাড়ে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের দুই বছর শেষ, বাকি আছে মাত্র ১৬ মাস। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরুই হয়নি।
প্রকল্পটির মেয়াদের অর্ধেকেরও বেশি সময় পার হলেও মুজিব কিল্লা নির্মাণ বা সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কেন কাজ শুরু হয়নি, জটিলতা কোথায়—তা খতিয়ে দেখতে স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন, জুয়েল আরেং ও মুজিবুর রহমান চৌধুরী এমপি। বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই উপ-কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি এ বি তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমানও অংশ নেন।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি এ বি তাজুল ইসলাম জানান, প্রকল্পটি গ্রহণ করার পর অনেক সময় অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। এটা কেন হয়নি, এর কী জটিলতা, কোথায় কী অনিয়ম—সেগুলো খতিয়ে দেখতেই উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সার্বিক বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সম্পূর্ণ রাজস্বখাতভুক্ত ১ হাজার ৯৫৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকার এই প্রকল্পে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ১৬ জেলার ৬৪ উপজেলা, বন্যা ও নদীভাঙন প্রবণ ২২ জেলার ৮৪ উপজেলায় বিদ্যমান ১৭২টি মুজিব কিল্লা সংস্কার ও উন্নয়ন এবং ৩৭৮টি নতুন মুজিব কিল্লা নির্মাণসহ মোট ৫৫০টি মুজিব কিল্লা নির্মাণ হওয়ার কথা।
জানা গেছে, মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মুজিব কিল্লা প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্পের নামের ছোট্ট একটি সংশোধনী ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইং থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতেই সময় লাগে দেড় মাস। ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর একনেকে প্রকল্প গৃহীত হওয়ার পর নভেম্বরের মাঝামাঝি পরিকল্পনা কমিশনে নামের সংশোধনী পাঠানো হয়। তাও প্রকল্পের সফ্ট কপি না পাঠানোর কারণে পরিকল্পনা কমিশন থেকে সংশোধনীর অনুমোদন দিতে সময়ক্ষেপণ হয়। সরকারের গত মেয়াদে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালেই প্রকল্পের জনবল কাঠামো অনুমোদন করে গেলেও সেটির অফিস আদেশও অধিদপ্তরে পাঠাতে গড়িমসির অভিযোগ ওঠে।
ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সদ্য সাবেক সিনিয়র সচিব শাহ কামাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাককে জানান, প্রকল্পটির পরিচালক নিয়োগ না হওয়াসহ কিছু কারণে কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া আছে। এছাড়া প্রকল্পটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বুয়েট, তারাও কিছুটা সময় নিয়েছে।
মুজিব কিল্লা প্রকল্প সম্পর্কে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে—যে কোনো দুর্যোগে, বিশেষ করে বন্যায় জানমাল রক্ষায় ব্যবহার করা হবে মুজিব কিল্লা। অন্য সময় মুজিব কিল্লাগুলো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করা হবে। ব্যবহার করা যাবে খেলার মাঠ ও হাট-বাজার হিসেবেও। সেখানে আয়োজন করা যাবে গ্রাম ও ইউনিয়ন কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানও। আয়োজন করা যাবে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কমিউনিটি উন্নয়নের লক্ষ্যে বৈঠক বা সভা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় অনুষ্ঠিতব্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের স্থান হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। সর্বোপরি দুর্যোগ পূর্ববর্তী, দুর্যোগকালীন বা দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে অস্থায়ী সেবাকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে এই মুজিব কিল্লা।
