ফারমার্স ব্যাংকের ৪ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আদালত। একই সঙ্গে আগামী ১৮ আগস্ট এই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রাখা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক শেখ নাজমুল আলম এই আদেশ দেন। মামলায় সব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হলো বলে জানান আইনজীবীরা। এদিকে এস কে সিনহাসহ মামলার আট আসামি বিচারের শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। পলাতক থাকায় ইতিপূর্বে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ গত জানুয়ারি মাসে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
গতকাল অভিযোগ গঠনের শুনানিতে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয় ফারমার্স ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক ও অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক চিশতীকে (বাবুল চিশতী)। এছাড়া জামিনে থাকা আসামি ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম শামীম, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ক্রেডিট-প্রধান গাজী সালাহউদ্দিন হাজির হন।
শুরুতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পড়ে শোনান বিচারক। পরে অভিযোগ গঠন থেকে অব্যাহতি চেয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন তারা। বিচারক অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে সব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। এই তিন আসামি ও বিচারপতি সিনহা ছাড়াও অভিযোগ গঠন করা হয়েছে ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, গুলশান শাখার ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট লুত্ফুল হক, এস কে সিনহার কথিত পিএস রণজিত্ চন্দ্র সাহা, রণজিতের স্ত্রী সান্ত্রী রায় (সিমি), টাঙ্গাইলের মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা।
পাবলিক প্রসিকিউটর ও দুদকের কৌঁসুলি রুহুল ইসলাম খান ইত্তেফাককে বলেন, ভুয়া তথ্য দিয়ে তত্কালীন ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) থেকে অন্যের নামে ৪ কোটি টাকার ঋণ সৃষ্টি করে পরে তা এস কে সিনহার ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। সেই ব্যাংক হিসাব থেকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির হিসাবে টাকা স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে পাচার করা হয়। এজন্য আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানি পাচার প্রতিরোধ আইনের ৪(২)(৩) ধারায় অভিযোগ গঠন করেছেন বিচারক। সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন দণ্ডে দণ্ডিত হবেন আসামিরা।
উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং কিছু পর্যবেক্ষণের কারণে ক্ষমতাসীনদের তোপের মুখে পড়েন বিচারপতি সিনহা। পরে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে ছুটিতে যান তিনি। ছুটিতে থাকাবস্থায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখান থেকেই রাষ্ট্রপতি বরাবর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। বর্তমানে বিচারপতি সিনহা কানাডায় অবস্থান করছেন।
বিদেশে থাকাবস্থায় গত বছরের ১০ জুলাই দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় বিচারপতি সিনহাসহ অপর আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ফারমার্স ব্যাংকে শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহার নামে মঞ্জুরকৃত ঋণের ৪ কোটি টাকা সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সুপ্রিম কোর্ট সোনালী ব্যাংক শাখার হিসাবে জমা হয়। পরে ঐ টাকা বিভিন্নভাবে স্থানান্তর করে উত্তোলন করা হয়। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অসত্ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে নিজেরা লাভবান হয়ে এবং অন্যদের লাভবান করতে এ ধরনের অপরাধ করেন। তারা অবৈধভাবে ভুয়া ঋণ সৃষ্টির মাধ্যমে ৪ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে নগদে উত্তোলন ও বিভিন্ন পে-অর্ডারের মাধ্যমে নিজ আত্মীয়ের নামীয় হিসাবে হস্তান্তরের মাধ্যমে আত্মসাত্ করেন। পরে তদন্ত করে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় দুদক।
