জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়ের উল্লেখযোগ্য অংশ কাটাতে হয়েছিল কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে—নির্জন সেলে। কথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক বক্তব্য প্রদান, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুনের চেষ্টাসহ বিভিন্ন হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা, ‘দি বেঙ্গল স্পেশাল পাওয়ার অর্ডিন্যান্স, ১৯৪৬’, যা পরবর্তী সময়ে অস্থায়ীভাবে পুনঃপ্রবর্তন ও ধারাবাহিকতা দেওয়া হয় ‘দি ইস্ট বেঙ্গল অ্যাক্ট, ১৯৫১’-এর মাধ্যমে, ‘দি ইস্ট পাকিস্তান পাবলিক সেফটি অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৮’ এবং ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস, ১৯৬৫’, যেগুলো নিরাপত্তা আইন নামে বেশি পরিচিত ছিল—এর আওতায় তাকে বারংবার গ্রেফতার ও আটক করে কারাগারে রাখা হয়েছিল। আদালতের আদেশে এক মামলায় মুক্তি পাওয়ার পর জেল গেটেই আবার আরেক মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল একাধিকবার।
সম্প্রতি জাতির জনকের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তার লেখায় তত্কালীন রাজনীতি, শাসকগোষ্ঠীর ভূমিকা, তার নিজস্ব ও অন্যান্য রাজনীতিবিদগণের ভূমিকা ও অবস্থান, তাকে বারংবার মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার ও নিরাপত্তা আইনে আটকের পাশাপাশি আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি বিবৃত করেছেন।
মিথ্যা মামলার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন—‘একজন কয়েদি কিছুদিন পূর্বে ২০ বছর সাজা খেটে মুক্তি পেয়েছিল, তিন বছরের মধ্যেই আবার ২৫ বছর জেল নিয়ে ফিরে এসেছে। খবর নিয়ে জানলাম, যারা তাকে খুনের মামলায় সাক্ষী দিয়ে জেলে দিয়েছিল তারা খুব প্রভাবশালী লোক। কোথায় একটা ডাকাতি ও খুন হলো আর তাকে আসামি করে সাক্ষী দিয়ে আবার সাজা দিয়ে দিয়েছে। শপথ করে বলল, এ ঘটনা সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। বাড়ি যেয়ে বিবাহ করেছিল। ঠিক করেছিল যে কয়দিন বেঁচে আছে, সংসার করবে আর কোনো গোলমালের মধ্যে যাবে না। প্রথম যখন জেলে এসেছিল তখন যে স্ত্রীকে রেখে এসেছিল সে তারই এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে পরে বিবাহ বসে। চাচাতো ভাইয়ের ভয় হয়েছে, যদি প্রতিশোধ নেয়। তাই সেও তার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল।’ (রোজনামচা পৃ. ১৯১)।
১৯৫০ সালে জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এক কয়েদি, নাম লুদু ওরফে লুত্ফর রহমানের পরিচয় হয়। বঙ্গবন্ধু আবার যখন ১৯৫৪ এবং ১৯৫৮ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আসেন তখন আবারও লুদুর সাক্ষাত্ পান। প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে লুদুর কারাগারে আসা-যাওয়া। ১৩ বছর বয়স থেকে চুরি ও পকেট মারতে শুরু করেছিল। বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়ে লুদু জেলখানায় আসে—আবার জামিন অথবা সাজা খেটে বের হয়। লুদুর জীবনকাহিনি বঙ্গবন্ধু বিশদভাবে তুলে ধরেছেন ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৪৭-৫৪)। কারাগারে থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, বছরের পর বছর ধরে অনেক হাজতিকে কীভাবে বিনা বিচারে কারাগারে থাকতে হতো। আমাদের বিচারব্যবস্থায় ‘টেলিফোনের’ একটা প্রভাব আছে মর্মে জনশ্রুতি আছে। বঙ্গবন্ধু এ বিষয়ে নিজ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এ ভাবে, ‘কোর্ট তো জেলগেটেই বসবে। মাত্র ছয় দিন আছে, কখন কাগজপত্র নিবে, নকল নিতে সময় লাগবে কোর্ট থেকে। কোন কোন অ্যাডভোকেট আসবে? এরা বিচারের নামে প্রহসন করতে চায়। মার্শাল ল’ যখন চলছিল তখনো বিচার পেয়েছিলাম, আজকাল জামিনের কথা উঠলেই টেলিফোন বেজে উঠে।’ (রোজনামচা, পৃষ্ঠা ১৮৫)।
মোবাইল কোর্টের অপব্যবহারের বিষয়েও বঙ্গবন্ধু অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। ঐতিহাসিক ৬ জুন ১৯৬৬। ছয় দফার সমর্থনে হরতালকে কেন্দ্র করে নিরীহ জনতার ওপর পুলিশের গুলি বর্ষণ, গণগ্রেফতার এবং সামারি কোর্ট করে সাজা দিয়ে শত শত নিরীহ ব্যক্তি, এমনকি শিশুদেরকেও সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘদিন বিভিন্ন পর্যায়ে কারাগারে থেকে আটক বিভিন্ন শ্রেণির বন্দিদের (হাজতি-কয়েদি ও নিরাপত্তা আইনে আটক) খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাদের দুঃখ, কষ্ট, হয়রানি, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, বন্দিদের সংসার ভেঙে যাওয়া, কারাগারের অভ্যন্তরের ঘুষ-দুর্নীতি, আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রভূত সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। সে কারণে—স্বাধীনতার পর তার প্রত্যয় ছিল আইন আদালত ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার করে এটাকে সহজতর করা, যাতে বিচার প্রার্থীদের দ্রুত ও সহজে বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা বঙ্গবন্ধুকে সব সময় পীড়া দিত এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি ছিলেন উদ্বিগ্ন ও উত্কণ্ঠিত।
বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন, ‘একটা কোর্টে বিচার গেলে একটা যদি সিভিল মামলা হয়; আপনি তো উকিল, স্পিকার সাহেব। আল্লাহর মর্জি যদি একটা মামলা সিভিল কোর্টে হয়, ২০ বছরেও সে মামলা শেষ হয় বলতে পারেন আমার কাছে?’
২৬ মার্চ ১৯৭৫ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু উপরিউক্ত বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বিচার বিভাগকে নতুন করে গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ঘোষণা দিয়েছিলেন—ইংরেজ আমলের বিচারব্যবস্থা পরিবর্তন করে মানুষ যাতে এক বছর, দেড় বছরের মধ্যে বিচার পায়, তার বন্দোবস্ত করার। একক জাতীয় দল ‘বাকশাল’ করার পর ২১ জুলাই ১৯৭৫ নবনিযুক্ত জেলা গভর্নরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন—‘আর, বিচারব্যবস্থা তাড়াতাড়ি বদলে ফেলা দরকার। বিচারের নামে অবিচার আর চলে না। এবার নতুন একটা কাঠামো করুন। সোজাসুজি বিচার হয়ে যাক।’
’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, ‘শাসনতন্ত্রের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা বিধান করা হবে। শাসনতন্ত্রে প্রশাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণের নিশ্চয়তা থাকবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রাখার মতো চরিত্রবান, জ্ঞানবান এবং ন্যায়বান ব্যক্তিরাই যাতে বিচার বিভাগের সদস্য হতে পারেন শাসনতন্ত্রে সেইরূপ বিধান রাখা হবে।’
বঙ্গবন্ধু ঘোষণাপত্রে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারকগণের যোগ্যতার বিষয়টিও উল্লেখ করেছিলেন। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭২-এ গৃহীত নতুন সংবিধানের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল, ‘আদালতের অধিকারের হস্তক্ষেপ করা হবে না’ এবং ‘দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবেই’। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)-এ মৌলিক অধিকার হিসেবে ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিতের বিধান করা হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২-এ রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১১৬ক সংযোজন করে বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণকে বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
কারাগার, আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন, ভাবনা ও প্রত্যয়সমূহ বর্তমান সময় থেকে ৬০-৭০ বছর আগের। কিন্তু তার ঐসব মূল্যবান অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যয়সমূহকে যদি বর্তমান সময়ের আইন-আদালত-বিচারব্যবস্থা সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়, তাহলে বলতে দ্বিধা হওয়ার কথা নয় যে, বঙ্গবন্ধু যেন বর্তমান সময়ের বাস্তবতাকেই লিখে গেছেন। আরো বলতে দ্বিধা নেই যে, আইন শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার-স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করার জন্য ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অঙ্গীকার’ পূরণে এখনো অনেক করণীয় রয়েছে—যার দায়ভার মূলত রাষ্ট্রের নির্বাহী ও বিচার বিভাগের। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি গভীর আন্তরিকতা ও অঙ্গীকার নিয়ে ভাবতে হবে। প্রণয়ন করতে হবে যথাযথ কর্মকৌশল—জনকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে এবং তার রক্তঋণ পরিশোধের জন্য।
n লেখক :বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ এবং
সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ
