অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুর লোকান্তর নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তার শিরোনাম দিয়েছিলেন বেশ অর্থবহ—ইন্দ্রপাত। সেই প্রবন্ধের এক জায়গায় তিনি বলছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন ক্রান্তদর্শী পুরুষ, যিনি আপন ব্রতে নিবেদিতপ্রাণ। স্বপ্ন দিয়ে তার যাত্রা শুরু, স্বপ্নের রূপায়ণে যাত্রা শেষ।’ অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই যে মন্তব্য—‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন ক্রান্তদর্শী পুরুষ’, আমার কাছে মনে হয় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এমন করে আর কেউ বলেননি। তিনি যথার্থই বলেছেন। তবে স্বপ্নের রূপায়ণে তার যাত্রা শেষ—এই
কথাটির সঙ্গে আমি একমত নই। শুধু বাংলাদেশ রূপায়ণের মধ্য দিয়ে তার স্বপ্নের রূপায়ণ শেষ হয়েছে বলে আমি মনে করি না। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশকে গড়বার সম্পূরক একটি স্বপ্নও তার ছিল। সেটি তিনি রূপায়ণ করতে পারেননি। ১৩১৪ দিন তিনি ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই সময়কে দুটি পর্বে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে—২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৫ পর্যন্ত। তার পরেরটি বাকশাল পর্ব। বাকশাল পর্ব যদিও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। প্রথম পর্বে তিনি একধরনের শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। লন্ডনে যখন একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছিলেন, তখন একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন—বাংলাদেশে গিয়ে আপনি কী করবেন, সেখানে তো সব এখন বিধ্বস্ত। বঙ্গবন্ধু তার স্বভাবসুলভ আত্মপ্রত্যয়ী ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মাটি আর মানুষ যদি থাকে, তাহলে আমরা আবার মাথা তুলে দাঁড়াব।’ সেই মাথা তুলে দাঁড়ানোর কাজ শুরু করেছিলেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরামাত্রই। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার মন্তব্য করেছিলেন—বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি হবে। অথচ বাহাত্তরের আগস্ট মাসের মধ্যেই সারা বিশ্ব থেকে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ অর্থনীতিতে আশ্চর্য রকম উন্নতি করতে থাকে। ১৯৭৫ সালের জুন-জুলাই মাসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আজকের বাংলাদেশে আমরা ৮ দশমিক ৩ বা ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার পেয়ে অনেক বেশি আত্মশ্লাঘা অনুভব করি। অথচ বঙ্গবন্ধু থাকলে আরো বহু দূর এগোতে পারতাম—কোনো সন্দেহ নেই।
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লন্ডনের ইকোনমিস্ট পত্রিকার সাংবাদিক মাইকেল বার্ন একটি প্রতিবেদন ছেপেছিলেন। এর আগে ঐ সাংবাদিক বাংলাদেশ ঘুরে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। এটা বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ দিকের ঘটনা। ঐ সাংবাদিক যে রিপোর্ট করেন, তার একাংশের বাংলা হচ্ছে—‘বাংলাদেশের সামনে কঠিন সময়। এই কঠিন সময়ে শেখ মুজিবের নেতৃত্ব বেশি প্রয়োজন হবে।’ কিন্তু বাংলাদেশের কিছু বিপথগামী সৈনিক বঙ্গবন্ধুকে ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে হত্যা করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—সেই যে হত্যাকাণ্ড ঘটাল, তারা যে সেনানিবাস থেকে ট্যাংক নিয়ে বেরিয়ে এসে গোলাগুলি করল, ৩২ নম্বর আক্রমণ করল—এটা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইনের চরম লঙ্ঘন। ‘বাংলাদেশ আর্মি অ্যাক্ট’ যাকে বলা হয়, সে অনুযায়ী তাদের তো কোর্ট মার্শাল হওয়ার কথা। কোর্ট মার্শাল হয়নি। বরং তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা যাবে না—এমন একটি অধ্যাদেশ জারি করে কুচক্রী খন্দকার মোশতাক। আর জিয়াউর রহমান এই অধ্যাদেশকে আইনের অন্তর্ভুক্ত করে। আমার প্রশ্ন হলো, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে বলে আমরা আত্মশ্লাঘা অনুভব করি, কিন্তু খুনিদের পেছনে যারা ষড়যন্ত্র করেছিল তাদের তো বিচার হয়নি। সেজন্য আমি মনে করি, এ বিচার অসমাপ্ত বিচার। আরেকটি দাবি আমি সব সময় করি—বাংলাদেশে এই যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তার দেশে-বিদেশে উত্স ছিল। সব তথ্য আদালতের সামনে এসেছিল। এর সব তথ্য সংকলিত করে প্রকাশ করা দরকার সরকারের। যাতে করে সকল ষড়যন্ত্রকারীর মুখোশ উন্মোচন হয়ে যায়। খুনিদের বিচার করলেই বিচার সমাপ্ত হয়, আমি তা বিশ্বাস করি না। বঙ্গবন্ধুর ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আবারও এই দাবিই করছি আমি।
